ঢাকা : বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০

সংবাদ শিরোনাম :

  • এখন থেকে নিম্ন আদালতে মামলা করা যাবে          সৌদি আরব থেকে ফিরলেন ৪১২ বাংলাদেশি          যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট নয় : ওবায়দুল কাদের          করোনাভাইরাস সারাবিশ্বটাকে স্থবির করে দিয়েছে : হাসিনা          করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংক ঋণের ২ হাজার কোটি টাকা সুদ মওকুফ ঘোষণা
printer
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১১:১০:৪৭
রোহিঙ্গা সংকট : শঙ্কা ও সংখ্যা
করীম রেজা


 


রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে শুধু নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে পরিকল্পিতভাবে। গত বছরের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত তাদের আচরণসহ সবকিছুতেই সন্দেহ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করে গেলেন। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে মিয়ানমারের মন্ত্রী রোহিঙ্গারা খুব খারাপ অবস্থায় আছে এ কথাটুকু শুধু বলেছেন। আশঙ্কা যেখানে তৈরি হয়েছে তা হলো মিয়ানমারের এই মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতের উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেছেন। কি বার্তা দিতে তিনি এসেছিলেন, জানা যায়নি।

 

তারও আগে বাংলাদেশ মিয়ানমার প্রত্যাবাসন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। স্বাক্ষরের আগে আগে চৈনিক নেতা ঘুরে গেছেন বাংলাদেশ। কি মন্ত্রণা দিয়েছিলেন, জানা যায়নি। পরবর্তীকালে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। এই সমঝোতা স্মারক এবং চুক্তি স্বাক্ষরে চীনের প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি বা কোনো বৈঠকের আগে কেউ না কেউ বাংলাদেশে ঘুরতে আসার ফুরসত পয়ে থাকেন। কাকতালীয় কিনা আমরা জানি না।

 

গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে যাওয়ার পরপরই দেখা গেল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থিত কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্য থেকে একটি পরিবার মিয়ানমারের ফিরে গেছে। গণমাধ্যমে ফলাও করে তা প্রচারিত হলো মিয়ানমারের তত্ত্বাবধানে। এর আগে আমরা দেখেছি, প্রত্যাবাসন চুক্তির শর্তানুসারে দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু করার কথা থাকলেও দুই মাস সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল যে তারা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার জন্য সব দিক থেকে প্রস্তুত। অথচ বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছিল যে অস্থায়ী আশ্রয় শিবির তখন পর্যন্ত প্রস্তুত হয়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তারা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ থেকে তাদের যথাসময় পাঠানো হচ্ছে না। মিয়ানমার নানা রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতেও করবে। ভারত ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফরের অল্প কিছুদিন আগে মিয়ানমারের তরফ থেকে বলা হলো কয়েক মাস আগে রোহিঙ্গা হত্যার দায়ে সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে ।

 

মিয়ানমার সরকারের আচরণ বিবেচনা করলে দেখা যায়, মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট তৈরি করা এবং পরবর্তী সময়ে সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, আন্তর্জাতিক বিশ্ব, প্রতিবেশী দেশ, এদের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে জিইয়ে রাখা যাবে, তা সুপরিকল্পিত। রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে প্রবেশ করতে না পারে তারা নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রশংসিত।

 

লক্ষ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই কমবেশি বিশ্ববাসীসহ আন্তর্জাতিক সমাজ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। চৈনিক ও ভারতীয় প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমূহের সমর্থনের গুরুত্ব না দিয়ে একটি অসম চুক্তি সম্পাদন করে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ। যে চুক্তিতে  আশ্রিত রোহিঙ্গা তথা বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট শর্তসমূহ খুবই দুর্বল। সম্পূর্ণ চুক্তির শর্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তারা জাতিসংঘকে পর্যন্ত চুক্তির আওতায় রাখে নাই। কিছুদিন আগে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে জানিয়েছে তারা জাতিসংঘকে  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করবে। এই ঘোষণার পরপর বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে।

 

বিশ্ববাসীর আকাক্সক্ষার বিপরীতে বিশেষ চাপের কারণে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তির সময় এই বিষয়গুলোকে মিয়ানমারের ইচ্ছাধীন করে রাখে। যে জন্য আমরা দেখতে পাই পরবর্তীকালে  ফিরে যাওয়া ১০ হাজার মানুষের তালিকা মিয়ানমার সরকারের কাছে দিলেও তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি। ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে। শ পাঁচেক লোকের তালিকা বাংলাদেশের কাছে ফেরত দিয়ে বলেছে, এরাই ফেরত নেয়ার যোগ্য।  কবে ফেরত নেয়া শুরু করবে সুনির্দিষ্টভাবে তা পরিষ্কার নয়। তারপর রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন কমিশনারের অফিস থেকে শ পাঁচেক সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ। বলা হয়েছে ৫ শয়ের অধিক লোকের তালিকা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এই যে নানান রকম কূটক চাল, সবকিছুই উদ্দেশ্যপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকট, সমস্যা চিরস্থায়ী করার অপকৌশল মাত্র।

 

রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানান রকম বিভ্রান্তিমূলক তথ্য। এখন পর্যন্ত সঠিক সংখ্যাটি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পক্ষ থেকেই বলা হয়নি। এমনকি জাতিসংঘের দেয়া সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের সংখ্যার গরমিল রয়েছে। সংখ্যা যাই হোক, যাই থাকুক একথা বলা যায় যে ১১ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে এটাই বাস্তবতা। ১১ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে একটি সম্প্রচার মাধ্যমে। প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত ৮ মাসে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদের কারণে এপর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৫ জন এবং শতাধিক মামলা রয়েছে।

 

রোহিঙ্গা সংকট ও সমস্যার সমাধান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হতে হবে। কোনোভাবেই দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা সফল হবে না। বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ, অধিকতর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বর্হিবিশ্বে সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ প্রচারণা বিশ্বজনমত সংগঠনের প্রধান উপায়। এছাড়া মিয়ানমারের ওপর কোনো প্রকার চাপ ফলপ্রসূ হওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মিয়ানমারের  অপকূটনৈতিক তৎপরতা।  তা না হলে সময়ে সময়ে মিয়ানমার পরিকল্পিত উপায়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করে সার্থক হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান বিষয়টি বিশ্ববাসী একসময় বিস্মৃত হবে। একটি চিরস্থায়ী সংকট হয়ে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে থাকবে।

 

আশঙ্কার আরো একটি কারণ রয়েছে, বর্তমানে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে নিরাপদ আবাস, খাদ্য ও বস্ত্রের জোগান পেয়েছে। মানুষের অন্য চাহিদাগুলো জোরালো হয় এরকম অনুকূল অবস্থায়। রোহিঙ্গাদের বেলায়ও তাই হবে। তখন তারা নানান রকম সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করবে, দাবি করবে। দাবি আদায়ে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেবে। এক সময় তাদের মধ্যে জঙ্গি মনোভাব চাড়া দিয়ে উঠবে এই আশঙ্কাও রয়েছে। তেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সমস্যা হবে বাংলাদেশের, আঞ্চলিক তথা আন্তর্জাতিক। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মিয়ামারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক প্রচার, প্রতিবেশিসহ অন্যান্য বন্ধু দেশের সঙ্গে দূতিয়ালি এবং বিশ্ব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd