ঢাকা : বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০

সংবাদ শিরোনাম :

  • এখন থেকে নিম্ন আদালতে মামলা করা যাবে          সৌদি আরব থেকে ফিরলেন ৪১২ বাংলাদেশি          যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট নয় : ওবায়দুল কাদের          করোনাভাইরাস সারাবিশ্বটাকে স্থবির করে দিয়েছে : হাসিনা          করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংক ঋণের ২ হাজার কোটি টাকা সুদ মওকুফ ঘোষণা
printer
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ১৩:০৮:৩৯
রোহিঙ্গা সংকট : গণমাধ্যমের আশু করণীয়
করীম রেজা


 


রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের এখন চলমান সমস্যা। প্রতিদিনই পরিস্থিতি বদল হচ্ছে। ২৪ ঘন্টায় অনেক রকম নতুন খবর তৈরি হচ্ছে এবং হওয়াই স্বাভাবিক। কখনো পুরনো বিষয় নতুন মাত্রা নিয়ে আলোচিত হয়, হচ্ছে। সবমিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট মানবজাতির অবিচ্ছেদ্য সংকট এবং সমস্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যেই নাম লিখিয়েছে। প্রসঙ্গের গুরুত্ব বিবেচনায় মুদ্রণের ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা প্রায় ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গা বিষয়ক সংবাদ দৃষ্টির  আড়ালে নিয়ে যায়। যেমন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তেমনি দেশীয় গণমাধ্যমেও। রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট খুঁটিনাটি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে  অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশিত হয় না। কোনও পত্রিকায় রোহিঙ্গাদের খবর কম গুরুত্বপূর্ণরূপে ভেতরের পাতায় ছাপা হয়।

 

দীর্ঘ সময় নিয়ে মিয়ানমার সরকার সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশছাড়া করেছে। তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী  স্থানীয় কিছু উগ্র বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের নিয়ে এমন ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল যাতে মাসখানেকের মধ্যে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশের সীমান্ত পার হতে বাধ্য হয়েছে। আরো কয়েক হাজার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

 

বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আর সীমিত নেই। রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আন্তর্জাতিক মাত্রায় বিবেচিত হচ্ছে।  যদিও বাংলাদেশ অসহায় মানুষদের আশ্রয় দিয়ে সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।  কিন্তু এতে করে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। উপরন্তু মিয়ানমার সরকার দক্ষভাবে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রাশিয়া, চীন এবং ভারতের সহযোগিতায় অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তারা কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত নয়। যদিও আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি লোক দেখানো, মুখ রক্ষাকারী প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছে। সেই চুক্তি কার্যকর করতে নানারকম টালবাহানা এবং গড়িমসি করছে। সময়ক্ষেপণ করছে এই উদ্দেশ্যে, যাতে সমস্যাটি দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা যায়। জিইয়ে রাখলে বিশ্ববাসী একদিন অন্যান্য সমস্যার কারণে রোহিঙ্গা বিষয়টি ভুলে যাবে।  তাদের এই অসৎ উদ্দেশ্যের কথা বিবেচনায় রাখলে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, এটা বাংলাদেশের জন্য কী পরিণতি ডেকে আনবে।

 

বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল উন্নয়নশীল একটি দেশ। এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশকে তার সীমিত সাধ্য ও ক্ষমতা দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও খাদ্যের যোগান দিতে হচ্ছে।  আন্তর্জাতিক বিশ্ব নানা রকম সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারপরও সমস্যার গভীরে একমাত্র বাংলাদেশ। ব্যবস্থাপনা ও মোকাবিলা শুধু বাংলাদেশকেই করতে হয়। এ অবস্থায় পৃথিবীবাসী মানবেতর জীবনযাপনকারী, নিজস্ব বাসভূমি থেকে যাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে অমানবিকভাবে, তাদের যাতনার কথা যাতে ভুলে না যায়, সেজন্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে অধিকতর সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

এই ভূমিকা দেশের জন্য এবং বিশ্ববাসীর জন্য তথা মানবতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। রোহিঙ্গা বিষয়টি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সম্প্রচার মাধ্যম এবং মুদ্রণ মাধ্যমে জারি রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। যে নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশে আশ্রিত একজন রোহিঙ্গাও  তার নিজের দেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সবরকম সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হবে।  বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি রোহিঙ্গা বিষয়ক কোষ বা ডেস্ক চালু করবে। যেখান থেকে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত ব্রিফিং, প্রেস রিলিজ, প্রেস নোট বা রোহিঙ্গা বিষয়ক যেকোন সংবাদ সরবরাহ করবে, সংবাদমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশের উদ্দেশ্যে।

 

অন্যদিকে প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে যেখানে শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সংবাদ ছাপা হবে। সম্প্রচার মাধ্যমেও তেমনি করে রোহিঙ্গা বিষয়ক সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গাবিষয়ক ডেস্ক গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে চলবে। এতে করে আমরা যেমন জাতীয় প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের বিষয়টি অবহেলা করবো না, ভুলে যাবো না; তেমনি বিশ্ববাসীও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিকভাবে যতই চেষ্টা করুক না কেন মিয়ানমারের সঙ্গে কোনোভাবেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সফল হবে না। কাজেই রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবে সমগ্র বিশ্বজনমত বাংলাদেশের পক্ষে রাখার জন্য পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা ও সম্প্রচার মাধ্যমের শিরোনামে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই মিয়ানমার সরকারের অপকৌশল নস্যাৎ করা সম্ভব হবে।

 

গত বছরের আগস্ট মাসে ঘটনার শুরু থেকে এপর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করলে সহজেই বুঝা যায় সমস্যাটি তারা বাংলাদেশের ঘাড়ে চিরস্থায়ীভাবে ঝুলিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। সেজন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গণমাধ্যমে নিয়মিত রোহিঙ্গাবিষয়ক সংবাদ প্রচারের বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এখনই পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে অনতিবিলম্বে। বাংলাদেশ অবশ্যই বিশেষ এবং ভয়াবহ সংকটে, তা কাটিয়ে উঠতে দরকার সুচিন্তিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট, ই-মেইল : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd