ঢাকা : বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • জাতীয় নির্বাচন ২৩ ডিসেম্বর          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার বুধবার থেকে নেবেন প্রধানমন্ত্রী          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ০৮ মে, ২০১৮ ১০:৫০:৪৬
উপকারী তালগাছ বিলুপ্তির পথে!
আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা


 


‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’Ñ তাল গাছ সম্পর্কে এমনভাবে আর কে-ই বা ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া? গ্রামবাংলার অতি চির চেনা ফল তাল। আকাশ পানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তালগাছ আর গাছে-গাছে ধরা তালফল ও বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা কত না মনোহর এবং পাখির কলতান কার না ভালো লাগে! তালের আদি নিবাস আফ্রিকা হলেও বাংলাদেশের সকল স্থানে ছোটবড় কমবেশি তালগাছ এখনও চোখে পড়ে। এমন এক অকৃত্রিম ও সত্যিই মানুষের মন ভোলানো দৃশ্য বগুড়ার সান্তাহার সাইলো রোড। এমন মাটি ও গাছপালার দৃশ্য দেখলে সকলের হৃদয়  নাড়া দেবেই।
মনোমুগ্ধকর তালগাছের এমন দৃশ্য দেখে কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন-এর সেই কবিতার কথাই মনে করিয়ে দেয়- ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ ঐ আমাদের গাঁ, ঐখানেতে বাস করে কানা বগীর ছা।’
তালের চারা রোপণ করে তা থেকে ফল ও সারবান কাঠ সব সময় কাজে লাগে। বর্তমানে গাছটির চাষ করতে অনেকেরই অনীহা। তবে এ ব্যাপারে প্রতি বছরই সরকারিভাবে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি পালন করা হলেও নিজ উদ্যোগে এখন আর কেউ তাল গাছের চারা রোপণ করতে চায় না। প্রতি বছর বৃক্ষ রোপণ মৌসুমে অন্যান্য বৃক্ষ চারার সংগে যদি তালগাছের বীজ/চারা বেশি করে সকলে মিলে রোপণ করা যায় আর নির্বিচারে যদি তালগাছ নিধন না করা হয় তাহলে এ দেশে আবারও উপকারী ফল তালগাছ ফিরে পাবে হারানো ঐতিহ্য। এর সাথে নিশ্চিত হবে আগামীর খাদ্য পুষ্টি, অর্থ ও সমৃদ্ধি।
তাল বৃক্ষ তার শিশুকাল থেকেই এর রোপণ ও পরিচর্যাকারীকে অর্থনেতিক কর্মকান্ডে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। তাল ফল ও তাল গাছের বহুবিধ ব্যবহার ও পুষ্টি গুণাগুণ বিবেচনায় দেশীয় ফলের মাঝে তালের অবদান শীর্ষে। অজ্ঞতা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজের চাহিদার কারণে দিন দিন যেভাবে তালগাছ নিধন করা হচ্ছে এতে প্রকৃতি পরিবেশ হারাচ্ছে তার অপরূপ সৌন্দর্য। নয়নাভিরাম সারি সারি তালগাছ, গাছে গাছে তাল ফল ও তালগাছে বাবুই পাখির বাসা আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। শুধু এতেই শেষ না, পাখিদের নিরাপদ নিবিড় আবাস গড়বে তাল গাছের নিবিড় বনায়ন। তাল গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তার জন্যই তো কারিগরি বাবুই পাখি এত সব গাছ থাকতে একমাত্র তাল গাছকেই বেছে নিয়েছে বসবাসের নিরাপদ স্থান হিসাবে।
গুচ্ছ মূলী বৃহৎ অশাখ বৃক্ষ তালগাছের গোড়ার দিক মোটা, উপরের অংশ তুলনামূলক চিকন, কান্ডের মাথায় বোটা ও পাতা গুচ্ছভাবে সাজানো থাকে ও বোটার দু-ধারে করাতের মতো দাঁত আছে, বোটা শক্ত ও খুব পুরু। গাছ উচ্চতায় ২০ থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ জীবি উদ্ভিদের মাঝে অন্যতম হচ্ছে তালগাছ। ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তুলনামূলকভাবে রোগ বালাইও কম। তাল গাছ পুরুষ ও স্ত্রী উভলিঙ্গ, একই গাছে দু-রকম ফুল ফুটে না। পুরুষ গাছে ফুল হয়, ফল হয় না; ফুল জটা নামে পরিচিত। মঞ্জুরির রঙ হলুদ, লম্বা আকৃতির, বসন্তে গাছে ফুল ধরে। পুরুষ তাল গাছের রেণু বাতাসে ভেসে অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়ে পরাগায়ন ঘটাতে সক্ষম। পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের সঠিক পরাগায়নে সৃষ্টি হয় তালের। তালগাছের বৃদ্ধি ধীরগতিসম্পন্ন, বীজ রোপণের ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সে গাছে ফল ধরে।
গাছ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত ফল ধরে থাকে, তবে এর পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। গাছে কাদিতে ফল ধরে, একটি গাছে অনেক গুলি কাঁদি ধরে, ফলের আকার গোলাকার চ্যাপ্টা, প্রতি ফলের গড় ওজন ১ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়, ফলের রঙ প্রথমে হলদে সবুৃজ, পরিপক্ব ফলের রঙ হলুদ, খয়েরি কালো রঙের হয়। তাল ফলে এক থেকে দুটি বা তিনটি আঁটির ফল ধরতে দেখা যায়। ফল পাকে ভাদ্র মাসে, তবে কোন কোন গাছে বছরের অন্যসময় ফল ধরতে দেখা যায়। পাকা ফলের ঘ্রাণ তীব্র সু-গন্ধযুক্ত, স্বাদে মিষ্টি থেকে পানসে মিষ্টি হয়। গাছে পাকা তাল আপনা আপনি ঝরে পড়ে। এ যাবৎ পর্যন্ত তালের কোন অনুমোদিত জাত নেই, সকল জাত স্থানীয়, তবে আকার আকৃতি স্বাধ-গন্ধ বিবেচনায় উত্তম, মাধ্যম ও নিম্নমানের হয়। আমাদের দেশের সকল জেলায় কমবেশি তাল গাছ জন্মে তবে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে ভালো তাল উৎপাদন হয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতে তাল গাছ জন্মে। সহজ রোপণ পদ্ধতি, কষ্টসহিষ্ণু, কম যতেœ উৎপাদন ও বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ বেড়িবাঁধ, রেল লাইন, পুকুর পাড়, খালের পাড়, নদীর পাড়, জমির আঁইল, পতিত জমি ও বসতবাড়ীর শেষ সীমানায় তালগাছ রোপণ উপযোগী স্থান।
উল্লেখ্য, গভীর মূলী ও শাখা-প্রশাখা নেই বলে জমির আইলে রোপণে খাদ্য পুষ্টির প্রতিযোগিতা ও ছায়া দিয়ে ফসলের ক্ষতি করে না। তালের পাতা দিয়ে হাত পাখা, মাদুর, টুপি, ঘরের ছাউনী, চাটাই, ছাতা, লাকরী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাছের ফাইবার বা আঁশ থেকে বিভিন্ন রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়, যথা- টুপি, ঝুড়ি, ব্রাশ পাপোস, ছোট বাষ্কেট, ও মাছ ধরার খলশানিতে ব্যবহৃত হয়। পুরুষ গাছের ফুল বা জটা হতে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড়, পাটালি, ভিনেগার, পিঠা, বড়া, লুচি, ইত্যাদি তৈরি করা হয়। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা, বড়া, খির, পায়েস তৈরি করা হয়। কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস মুখরোচক পুষ্টিকর ও ছোট বড় সবার প্রিয়। এছাড়া গ্রীষ্মের তৃষ্ণা নিবারণে কাজ করে। তাল গাছের গোড়ার অংশ দিয়ে ডিঙ্গি নৌকা তৈরি, শক্ত ও মজবুত বলে ঘরের খুঁটি, আড়া, রুয়া, বাটাম, কৃষকের লাঙ্গলের ঈষ তৈরি করা হয়। গাছ শক্ত মজবুত গভীরমূলী বলে ঝড়-তুফান, টর্নেডোর বাতাস প্রতিরোধ ও মাটি ক্ষয় রোধে তালের গাছের ভূমিকা অতুলনীয়। তাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার, তালের রস শে¬ষমানাশক, মূত্রবর্ধক, প্রদাহ ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিবারণ করে। রস থেকে তৈরি তাল মিছরি সর্দি-কাশিতে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। যকৃতের দোষ নিবারক ও পিত্তনাশক হিসেবেও কাজ করে তাল।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সারা দেশ পাতার আরো খবর

Developed by orangebd