ঢাকা : সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

সংবাদ শিরোনাম :

  • টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে মিথ্যাচার করছে বিএনপি : ওবায়দুল কাদের          করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমতি          আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে বারবার হত্যা করেছে : ফখরুল          করোনায় মৃত্যু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র          সবার আগে আমি ভ্যাকসিন নেব : অর্থমন্ত্রী          পঞ্চম ধাপে ২৮ ফেব্রুয়ারি সব পৌরসভায় ইভিএমে ভোট
printer
প্রকাশ : ২৬ জুন, ২০১৮ ১৭:৩০:০০
মাদক অভিযান নিয়ে দুই-এক কথা
করীম রেজা



 
মাদক নির্মূলে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান  চলছে। এ অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক ছাড়িয়েছে। গত ৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পরদিন থেকে র‌্যাবও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
 
মাদকের বিস্তার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। যুবসমাজ বিশেষভাবে আসক্ত। বিভিন্ন সংস্থার অনুমান, দেশে প্রায় এক কোটি লোক মাদকের শিকার। প্রায় চার কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ৩০ হাজার মা-বাবা মাদকাসক্ত ছেলে-মেয়ের হাতে নিহত হয়েছে। নিগ্রহ, যন্ত্রণার সংখ্যা অগণ্য। এখনও মাদকাসক্ত কিশোরী ঐশীর রোমহর্ষক ঘটনা পীড়াদায়ক স্মৃতি।  দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অসংখ্য মাদক নিরাময় চিকিৎসা কেন্দ্র দেখে ভয়াবহ মাদক বিস্তারের ধারণা পাওয়া যায়।
 
শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয় প্রবাসীদের মধ্যেও মাদকের বিস্তার ঘটেছে। ফেসবুকে বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানের পক্ষে স্বাগত জানিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়। বিদেশের মাটিতে প্রবাসী বাঙালি সমাজে মাদক ব্যবসায়ের যারা গডফাদার তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে কে- জাতীয় প্রশ্ন উচ্চারিত হয়।    
 
মাদকের উৎপাদন হয় বাংলাদেশের বাইরে। করিডোর হিসেবে এই দেশকে ব্যবহার করে মাদক বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাচার-বিপণন হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর-কর্মকর্তা এবং দেশের গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষভাবে জানা রয়েছে কোন পথে, কীভাবে, কখন, কাদের মাধ্যমে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং দেশের বাইরে চালান হয়। সবকিছু জানা থাকা সত্ত্বেও মাদকের বিপণন ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ হয়নি। তবে আশার কথা, অভিযানে বিস্তর মাদক সংশ্লিষ্ট লোকজন ধরা পড়ছে বা নিহত হচ্ছে। অভিযানের ফলে জানা যাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা আগ্নেয়াস্ত্রও বহন করত। আগ্নেয়াস্ত্রের পারস্পরিক ব্যবহার ও প্রয়োগ আরম্ভের আগেই সমূলে উৎপাটন জরুরি। অভিযানে প্রচুর গোলাবারুদসহ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের খবর স্বস্তিদায়ক। 
 
১৫ মে থেকে দেশব্যাপী এ পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত  হয়েছে ১৭১ জন। ২৪ জুন রোববার পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ২৮৫৭৩ জন। বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ বিভিন্ন রকমের মাদক, অস্ত্র, গুলি ইত্যাদিও জব্দ হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের ছবি দেখে কিংবা পরিচয় জেনে বোঝা যায় তাদের অধিকাংশ তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র মানুষ। পুলিশের দাবি অনুযায়ী এরা সবাই চিহ্নিত তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। এতদিন এই মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা না পড়লেও অভিযানে তাদের ধরা কিংবা আটক করা সম্ভব হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের গ্রেফতার করা যায় না; কিন্তু এখন ক্রসফায়ারে বা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কমবেশি তাদের অনেকে মারাও যাচ্ছে।  
 
নানা পত্রিকার খবরে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উঁচু পর্যায়ের কিছু কিছু কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। উঁচু পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাদক আমদানি, পরিবহন, বিতরণ ও বিক্রয় নিরাপদে করা সম্ভব নয়। পর্দার অন্তরালে থাকা প্রধান মাদক ব্যবসায়ীরা এই অভিযানে ধরা পড়ছে না। নিন্দুকেরা বলেন, সমাজের উপরতলায় প্রভাবের কারণেই উচ্চ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ীরা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। মাদকের  কেনাবেচায় সারাদেশে  নেটওয়ার্ক তৈরিতে কারা জড়িত, এ বিষয়ে পত্রিকার অনুসন্ধানী রিপোর্টে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নাম এসেছে। আবার অনেকের নামই আসেনি। পত্রপত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সংবাদে প্রকাশ, পুলিশ-বিজিবি বা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। অতীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক বিভাগের অবহেলা ছিল বলে অনেকেই অভিমত দিয়েছেন।
 
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সবরকম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করে। এলাকার পুলিশ দফতরের নথিতে মাদকসহ সব অপরাধীর বিস্তারিত তথ্য থাকে। অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় না আনলে সমাজ উপকৃত হয় না। ঘোষিত অভিযানের আগে-পরে গ্রেফতারে তারতম্য দেখা যায়। অভিযানের আগে গুলি বা ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য ছিল না। নিহতরাও দেশের নাগরিক, সাংবিধানিক অধিকার তাদেরও আছে। বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যা সমর্থনযোগ্য নয়। 
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিদফতরের পরিচালকের ভাষ্য- সারাদেশে আড়াই লাখ মাদকের মামলা বিচারাধীন, সাক্ষীর অভাবে অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয় না। পুলিশ সাক্ষীরা অবসরে গেলে, আর পাবলিক সাক্ষীরা অনেক সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তিসহ সাজার হার কম। 
 
বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার মাদক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাণদন্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীদের তরফ থেকে সংশোধিত আইন প্রস্তাবটি প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের কতিপয় ধারা অপব্যবহারের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত আইনের বিধান রয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু প্রয়োগ কিংবা অপব্যবহারের কারণে তা অনেক ক্ষেত্রেই সুফল আনতে পারে না। তারপরও কঠিন শাস্তির বিধান নিশ্চয়ই অপরাধ ও অপরাধী উভয়ের জন্যই আগাম সতর্কতা বৈকি। কঠোর আইন কখনো কখনো প্রতিষেধকের মতই উপকারী হতে পারে। স্মরণযোগ্য যৌতুক কিংবা বাল্যবিবাহনিরোধ আইন সমাজে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। কঠিন আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্যোগ নিতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে সমাজকে সচেতন করার কার্যক্রম। জীবনের সবস্তরে একমাত্র সমাজমানসই পারে অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে। 
 
অদূরদর্শী অপেশাদারী আচরণে মাদকবিরোধী অভিযান কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ। ঢাকঢোল অগ্রিম পিটুনির কারণে মাদকের আখড়া হিসেবে ঢাকা শহরের সুপরিচিত জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রকরা অভিযানের আগেই পালিয়ে আত্মগোপন করেছে। তাছাড়া বহু দাগী মাদক ব্যবসায়ী অনেকবার গ্রেফতার হয়েও জামিনে বেরিয়ে আসে। এই অভিযানকালে তাদের অনেকেই এখন জেলখানায় নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে- পত্রিকান্তরে খবর।
 
বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সংস্কৃতি বিএনপি সরকারের সময় চালু হলেও আর থামেনি। বিএনপির পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সম্পর্কে গতানুগতিক বক্তব্য দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতি বিষয়ে কোন নীতি নির্দেশনাও নেই, তাদের বক্তব্যে।
 
অভিযান পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষ অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে সাধুবাদ তখনই সার্থক হবে যখন মাদক ব্যবসায়ের মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। ভূতের সরষে দিয়ে আর যাই  হোক ভূত দূর করা যায় না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা-নিষ্ঠা নিশ্চিত করা দরকার। প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। দরকার সমন্বিত উদ্যোগে অভিযান পরিচালনা। তবেই মাদকের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। নতুবা মাদকাসক্ত যুবসমাজ পঙ্গু এবং সামাজিক বোঝা হিসেবে জাতীয় উন্নতির অন্তরায় হয়ে থাকবে । 
 
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবহিনীর সাফল্যের খতিয়ান নেহাত খাটো নয়। তাদের পেশাগত দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক মানের। একটি বাহিনীর কতিপয় সদস্যের আচরণে পুরো প্রক্রিয়া থেমে না গেলেও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই  সাধারণ মানুষ কার্যকরভাবে মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় দেখতে চায়। কাজির গরুর দশা নয়, অভিযানের নামে শুধু অভিযান  নয়, প্রকৃত অর্থেই মাদকের বিস্তার বন্ধ দেখতে চায়। 
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট, ই-মেইল : karimreza9@gmail.com

 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd