ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : সিইসি          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ১৯ জুলাই, ২০১৮ ১০:৫৪:২৪আপডেট : ২৪ জুলাই, ২০১৮ ১৪:৫৮:০৯
প্রকৃতির রহস্য বগালেক
করীম রেজা

 

ছড়াকার-সাংবাদিক ইউসুফ আলী এটম ও আমি ছাড়া দলের বাকি সবার বয়স  ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। সমতলের মানুষের কাছে পাহাড় কিংবা সাগরের হাতছানি থাকেই। আর পাহাড় ট্র্যাকিং করায় আনন্দ, উত্তেজনা, ভয় সব একত্রে মিশে থাকে।
বান্দরবান থেকে রুমার পথে পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই। হেলে দুলে পাহাড়ি পথে চলার বাস্তব অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ঘণ্টা দুই-তিন বোধ করি লেগেছিল রুমা বাজারে পৌঁছতে। রাস্তা থেকে দেখলাম, বাঙালি বাড়ির পরিবেশের অপরিচ্ছন্নতা, পাহাড়িদের  পরিচ্ছন্ন পরিপাটি পরিবেশ।
বান্দরবানে হালকা বৃষ্টি ছিল, রুমা পৌঁছানোর আগেই সূর্যের দেখা মেলে। সামরিক ক্যাম্পে নাম রেজিস্ট্রি করে রুমা বাজার থেকে চান্দের গাড়িতে বগালেক পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত যাওয়ার বন্দোবস্ত। রাস্তার খাঁই-খাঁড়াই এমনই যে, কারো মতে এ যেন বিনে পয়সার রোলার কোস্টার। জিপ বা চান্দের গাড়ি রাস্তার খাঁড়া দিকে যখন ওঠে তখন খোলা আকাশ একমাত্র দর্শনীয়। কখনো অসমান সমতল সামান্য রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে নিম্নমুখী অথবা আবার উঠে গেছে সেই উপরে। উপরটুকু উঠেই হয়তো আবার দেখা মিলবে গহিন খাদের। জিপ গাড়ি উল্টে যাওয়ার আতঙ্ক।
প্রকৃতির রহস্য বগালেক
১৮ কিলোমিটারের অর্ধেক পথে চান্দের গাড়ি থামে, এখান থেকে হেঁটে এগোতে হবে প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ। প্রখর রোদে আমরা হাঁটতে লাগলাম পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথে। উঁচু-নিচু রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেই বুঝলাম কত কঠিন পাহাড়ের অভিযাত্রী হওয়া। আমরা দুই-তিনজন ছাড়া দলের সবাই ততক্ষণে অনেকটা পথ এগিয়ে নিচে নেমে বিশ্রাম নিচ্ছে।  
যাহোক, অবশেষে আমরা বগা লেক গ্রামের প্রান্তে গিয়ে পৌঁছালাম। সামান্য সমতল জায়গা। ভেজা শরীরে কেউ ঘাসের উপর শরীর এলিয়ে দিয়েছে, অন্যরা কেউ বসে বা দাঁড়িয়ে। অনতিদূরের সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পে নথিভুক্তির পর আমরা গ্রামের ভেতর প্রবেশ করি।
বগালেক বা বগাকাইন গ্রামে সবমিলিয়ে ২৯ পরিবারের আবাস। সবাই একই পরিবারের বংশধর। লেকের পাড়ে পাহাড়ের কোলে ছোট গ্রাম। সারিবাঁধা ঘরের সামনে উঠানের মতো সমতল জায়গা। উঠোনের শেষ মাথায় একটি গির্জা। সবাই যিশুখৃস্টের অনুসারী। জাতি হিসেবে বম জনগোষ্ঠীর মানুষ তারা। ছেলেমেয়েরা সবাই শিক্ষিত। শিশুদের দলবেঁধে চলতে দেখলেও, তরুণ-তরুণীদের গ্রামে তেমন চোখে পড়েনি। শহরে মিশনারিতে থেকে লেখাপড়া করে। নারীরাই কাজে ব্যস্ত, পুরুষদের খুব কম দেখলাম। ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা শেষ করে গ্রামেই ফিরে আসে। কোথাও কাজ করলেও এলাকাতেই নিয়োগ পেতে চেষ্টা করে। রিচার্ড নামের উচ্চশিক্ষিত একজন এখন গ্রামেই কটেজ ব্যবসা শুরু করেছেন, তার বাবার বোন সিয়ামের মতোই।
বগালেকের তিনদিকে পাহাড়। পাহাড়ে বম, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা এবং অন্য আদিবাসীদের আবাস। বগালেক নিয়ে আছে কিংবদন্তি। অনেকদিন আগে এখানে একটি চোঙা আকৃতির পাহাড় ছিল। আশপাশের গ্রামের গবাদিপশু এবং কমবয়সী ছেলেরা প্রায়ই ওই পাহাড়ে হারিয়ে যেত। অতিষ্ঠ গ্রামের কয়েকজন সাহসী যুবক ওই পাহাড়ে এক গুহায় ভয়ঙ্কর দর্শন একটি ড্রাগন (বম ভাষায় বগা অর্থ ড্রাগন) দেখতে পায় এবং হত্যাও করে। সঙ্গে সঙ্গেই গুহা থেকে আগুন বেরিয়ে এসে পার্শ্ববর্তী সব পুড়িয়ে দেয়, হঠাৎ ভূমিকম্পের ফলে এই লেকের সৃষ্টি হয়।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, তিন কারণে এই লেক তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ভূমিধস, উল্কাপি- পতন কিংবা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। কারণ যাই হোক এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭০০ ফুট উপরে একটি আবদ্ধ মিঠাপানির জলাশয়। এই হ্রদের পানির উৎস সম্পর্কে এখনো সঠিক গবেষণা হয়নি। বগালেকের প্রায় ১৫০ ফুট নিচে বগাছড়া নামে একটি পাহাড়ি জলধারা রয়েছে। এই ছড়া বগালেকের পানির উৎস গবেষকদের এমন ধারণা পাওয়া যায় না। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এই প্রকৃতির রহস্য বগালেক
বগালেকের পানির রঙে বদল ঘটে বলে অনেকে অনুমান করেন। হ্রদের তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবন রয়েছে। সেখানে পানি প্রবাহের ফলেই উপরের লেকের পানির রঙ বদল ঘটে। বিস্ময়কর হলেও সত্যÑ হ্রদের পানির আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, জলজ আগাছা দেখা যায়, মাছও। গায়ে পানি ঢাললে বেশ কোমল এক ধরনের অনুভূতি জাগে। চারদিকে বড় বড় পাথর ইতস্তত ছড়ানো। ছোট ছোট তো আছেই, লেকের তলদেশে, পাড়েও আছে অনেক। গ্রামের মহিলা শিশুরা এখানে নিয়মিতই গোসল করে।
হ্রদের পানিতে সর্বপ্রথম ডুবে মরা গ্রামের এক কিশোরীর কবর গ্রামেই। বম ভাষায় লেখা পাথরের ফলকে তার স্মৃতি সংরক্ষিত। হ্রদের রহস্যঘেরা বগালেক চারদিকের সৌন্দর্যে মানুষকে বার বার আকর্ষণ করবে তার প্রাকৃতিক বিত্ত-বেসাত উপভোগের হাতছানিতে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
পর্যটন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd