ঢাকা : সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

সংবাদ শিরোনাম :

  • টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে মিথ্যাচার করছে বিএনপি : ওবায়দুল কাদের          করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমতি          আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে বারবার হত্যা করেছে : ফখরুল          করোনায় মৃত্যু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র          সবার আগে আমি ভ্যাকসিন নেব : অর্থমন্ত্রী          পঞ্চম ধাপে ২৮ ফেব্রুয়ারি সব পৌরসভায় ইভিএমে ভোট
printer
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৮ ১২:৩৮:০৬আপডেট : ৩১ জুলাই, ২০১৮ ১৫:৪২:৫৪
আমাদের চিকিৎসক ও চিকিৎসা নীতি
করীম রেজা

 

বাংলায় প্রবাদ আছে কাক কখনো কাকের মাংস খায় না। ডাক্তাররা প্রবাদের সত্যতার প্রমাণ দিলেন বিচারালয়ে। চুয়াডাঙ্গায় বেসরকারি হাসপাতালে গত মার্চে অস্ত্রোপচারের পর ২০ জনের ‘চোখ হারানো’র বিষয়ে দুই মাসের ব্যবধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আদালতে স্ববিরোধী দুটি প্রতিবেদন দাখিল করায় হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে বলা ছিল, ছানি অপারেশন ও জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণেই রোগীদের একটি করে চোখ নষ্ট হয়েছে। আর দুই মাস পর ১৫ জুলাইয়ের দ্বিতীয় প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ভূয়সী প্রশংসা করে কারণ হিসেবে সংক্রমণ চিহ্নিত করা হয়। আদালত বলেছেন, ‘বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট প্রমাণ করে, আমাদের দেশে ডাক্তারদের নৈতিকতার মান কোথায়!’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০ জন রোগীর একটি করে চক্ষু নষ্ট হলেও অন্যটি এখনো ভালো আছে’। ডাক্তারদের এমন মন্তব্যের বিেেশ্লষণ এখানে নিষ্প্রয়োজন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে রাইফা নামের শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রের নৈরাজ্য নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জনকে প্রধান করে গঠিত কমিটির তদন্তে চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলায় রাইফার মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ম্যাক্স হাসপাতালের লাইসেন্সসহ ১১টি অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ১৮ জুলাই বুধবার শিশু রাফিদা খান রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় বিতর্কিত ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলীসহ চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান বাদী হয়ে চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় এজাহার দায়ের করেন।
রাইফার মৃত্যুর কারণ তদন্তে দীর্ঘদিনের বিরাজমান অনিয়ম অন্যায় সাধারণ মানুষ জানতে পারছে।  রাইফার হতভাগ্য পিতা সংবাদমাধ্যমের একজন হওয়ায় ঘটনার ব্যাপক প্রচার হয়েছে। সাধারণ কোনো রোগীর বেলায় অবশ্যই তা সম্ভব হতো না। তদন্তের কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতর কিংবা স্থানীয় সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন আজ প্রশ্নবিদ্ধ। চিকিৎসা ক্ষেত্রের নৈরাজ্য, চিকিৎসকের নৈতিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
জীবন সংকটে প্রধান ভরসাস্থল ডাক্তার। ডাক্তারি সেবামূলক পেশারূপে সমাজে অত্যন্ত সমাদৃত। ডাক্তার চিকিৎসা করেন অর্থের বিনিময়ে। সমাজে অর্থের বিনিময়ে আরো অনেক সেবা পাওয়া গেলেও চিকিৎসাসেবা একটি নীতি ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্য দশটি সেবার সঙ্গে কোনোভাবেই তুলনীয় নয়।
যেকোনো চিকিৎসালয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ডাক্তাররা সেবা দিয়ে থাকেন। অন্যান্য পেশার তুলনায় ডাক্তারদের কাজের ক্ষেত্র এবং পরিবেশ ভিন্ন। জনঘনত্বের কারণে সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। নানা কারণে একজন রোগীর মৃত্যু হতে পারে। তা বিবেচনায় না নিয়ে প্রথমেই ডাক্তারের ওপর আসে আক্রমণ, এটা বাস্তবতা। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়, রোগীর উত্তেজিত স্বজনদের তোপের মুখে পড়তে হয় একজন ডাক্তারকে।
অন্যদিকে ডাক্তাররা রোগী কিংবা রোগীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হন। রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত না করে, মানুষের জীবন সংকটাপন্ন করে ডাক্তাররা কর্মবিরতি পালন করেন। নৈতিকতার প্রশ্নটি এখানে খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে আসে। মূলত কর্মবিরতি দিয়ে রোগী জিম্মি করা সমাধানের কোনো উপায় হতে পারে না।
যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ৪০০ বছর আগে গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শপথ লিখে গেছেন। আমাদের দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সেই শপথবাক্য প্রচলিত আছে।
২৭ মে ২০১৪ একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যেখানে দেখা যায়, ‘বিএমডিসি আইনসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট প্রায় সব আইন ডাক্তারদের স্বার্থরক্ষার উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছে। রোগীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো গরজ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনগুলোর খসড়া তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন ডাক্তারদের প্রতিনিধিরা।’ তাহলে সাধারণ মানুষ দাঁড়াবার জায়গা পাবে কোথায়!
সাধারণ জনগণ মনে করেন এসব আইনের ধারায় ডাক্তাররা যাতে নীতি-নৈতিকতা মেনে চলেন, না মানলে যেন শাস্তি দেয়া যায় সে ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। একজন সত্যিকারের চিকিৎসক তার ব্যক্তিগত শত্রুকেও সুচিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তুলবেনÑ এটাই এ পেশার নৈতিকতা। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সীমাহীন নৈরাজ্য চলছে। মানবসেবার ব্রতে শপথ নেয়া চিকিৎসক সমাজ এখন অনেক ক্ষেত্রে মানব দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে।
দেশে সুচিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় ডাক্তারদের রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নির্দয় আচরণ, অতিরিক্ত ওষুধ লেখা, প্রয়োজন না থাকলেও নানান রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেয়া, পরীক্ষার রিপোর্ট দেখাতে গেলে আবারো ফি নেয়া, ডাক্তারের ফি অত্যন্ত বেশি, এরকম নানা খবর পত্রিকায় দেখা যায়। এসবের ফিরিস্তি অনেক লম্বা।
ব্যাঙের ছাতার মতো সারাদেশে মেডিকেল ক্লিনিক বা ছোটখাটো হাসপাতাল, ডায়গনস্টিক সেন্টার গজিয়ে উঠেছে। ক্লিনিক ব্যবসার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে ডাক্তার জড়িত, অংশীদার হিসেবে অথবা একক মালিক হিসেবে। সেখানে অনেক রকমের অনিয়ম সংঘটিত হয়। অযোগ্য টেকনিশিয়ান, মেয়াদ-উত্তীর্ণ কেমিক্যাল ইত্যাদি ব্যবহার করে  রিপোর্ট দেয়া হয়। এসব বিষয় পত্রিকার পাতায় সুনির্দিষ্টভাবে লেখা হয়। কয়েকদিন পত্রিকায় লেখালেখি এবং সামাজিক আন্দোলন হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটু নড়াচড়া করে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ক্লিনিকগুলো বহাল তবিয়তে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যায়। অনেক ক্লিনিককে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দাপটের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়।
ডাক্তাররা নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে এখন শুধু অর্থ রোজগারে ব্যস্ত থাকেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন, বেসরকারি ক্লিনিকে সময় দেয়া এবং প্রাইভেট প্রাকটিস, সব মিলিয়ে এতটাই যন্ত্রের মতো ব্যস্ত থাকেন যা একজন মানুষের পক্ষে চিন্তা করা যায় না। অত্যধিক চাপের কারণে ব্যস্ত সময়ের মধ্যে ডাক্তার ইচ্ছে থাকলেও বাস্তব কারণে একজন রোগীর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হতে পারেন না। বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে যেসব ডাক্তার রোগী দেখেন সেখানে ক্লিনিকের পক্ষ থেকে নানান রকম চাপ থাকে। তার পরে রয়েছে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের  নানারকম ওষুধ লিখিয়ে নেয়ার চাপ। ওষুধ কো¤পানির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে ওই কোম্পানির ওষুধ তাকে লিখতেই হয়।
আবার দেখা গেছে, কোম্পানির প্রতিনিধি ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোগী বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে পরীক্ষা করেন তার কো¤পানির ওষুধ লিখেছেন কিনা!
বেসরকারি মেডিকেল ক্লিনিকগুলো ডাক্তারদের বিশেষ করে যাদের একবার সুনাম হয়েছে তাদের তার ক্লিনিকের চেম্বারে বসানোর জন্য ফ্ল্যাট, গাড়ি, অধিক আয়ের নিশ্চয়তা ইত্যাদির দ্বারা অনেক রোগী দেখতে বাধ্য করেন। তারপর রয়েছে কমিশন বাণিজ্য, প্রয়োজন না থাকলেও নানা রকম ইনভেস্টিগেশনের নামে পরীক্ষার দীর্ঘ তালিকা ধরিয়ে দেয়া হয়। যার মূল্যের একটা নির্দিষ্ট অংশ ডাক্তার পেয়ে থাকেন। ডাক্তারদের ভিজিট ও কমিশন নিয়ে যে প্রকাশ্য বাণিজ্য চলছে তা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ডাক্তারদের অবহেলা, ভুল ওষুধ প্রয়োগ, হাসপাতালের অব্যবস্থা ইত্যাদি নানান কারণে রোগীর মৃত্যু হলে অথবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ডাক্তাররা আর দশজন সাধারণ পেশাজীবীর মতোই রোগীদের জিম্মি করে আন্দোলন শুরু করেন। সেখানে জীবন সংকটাপন্ন রোগীর অবস্থা তারা বিবেচনা করেন না। এসব কারণে ডাক্তারদের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধ দিনে দিনে লোপ পেতে বসেছে।
সম্প্রতি আমরা দেখলাম সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক রাতের নির্জনতায় রোগীর স্বজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন।  ডাক্তার সাধারণ মানুষের জীবন সংকটে ভরসাস্থল। সেই ভরসার জায়গাটি যদি একজন ডাক্তার অক্ষুণœ রাখতে না পারেন, তিনি যদি তার সম্মানজনক পেশার অবমাননা করেন তার সমুচিত শাস্তি বিধান হওয়া উচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা ক্ষেত্রের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং যুগোপযোগী আইন  কার্যকর হয়নি।
মাননীয় মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নানা সময়ে আইন প্রণয়ন, সংশোধন সম্পর্কে কথা বললেও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যার কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বচ্ছতা, অস্থিতিশীলতা বিরাজমান। সাধারণ মানুষ দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা হারিয়ে ফেলার কারণে বিদেশমুখী হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানস¤পন্ন স্বনামখ্যাত অনেক চিকিৎসক রয়েছেন। অনেক ভালো হাসপাতাল রয়েছে। তারপরও চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের নীতিহীনতা প্রকট। প্রায়ই অঘটন ঘটছে। রোগী তার আত্মীয়স্বজন, ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিক এরা সবাই একে অন্যের বিপক্ষ হয়ে মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করেন। ডাক্তাররা যেমন রোগী এবং তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভালো, উপযুক্ত ব্যবহার করেন না, তেমনি নার্স প্যারামেডিক এদের সঙ্গেও যথোপযুক্ত ব্যবহার করেন না; এমন অভিযোগ রয়েছে।  ক্লিনিক মালিকদের আকাশচুম্বী মুনাফা লাভের কারণে  এই সেবামূলক চিকিৎসা পেশাটি আজ প্রশ্নবিদ্ধ এবং  কলঙ্কিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে আমরা যতই আধুনিক কারিগরি চিকিৎসা সুবিধার আয়োজন করি না কেন তাতে করে স্বাস্থ্যসেবার মানে কোনো উন্নয়ন ঘটবে না। ডাক্তার, নার্স, অভিভাবক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি আইনের মাধ্যমেই নির্ধারিত থাকলে সবার জন্য মঙ্গল। যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় যথাযথ তদন্ত করে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো ছাড়া সেবার মান উন্নত করা আদৌ সম্ভব নয়। ডাক্তারদের দলাদলি ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। বদলি, পদায়ন, অদরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এমনকি অপারেশনের মাধ্যমেও হাসপাতালের মুনাফা বাড়ানোর জন্য ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ডাক্তারদের চাপ দেয়া চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বভাবতই যারা চিকিৎসা পেশায় আসেন তাদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ সততা, দায়িত্বশীলতা, মহানুভবতা, দয়াশীলতা, নীতি-নৈতিকতা, জনকল্যাণ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় মানবিক গুণাবলী অনেক বেশি আশা করে। ডাক্তারদের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা বেশি কিছু নয়। তারা চায় একটু ভালো ব্যবহার আর ভালো সেবা। লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd