ঢাকা : বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২৯ জুলাই, ২০১৮ ১৯:১২:১২আপডেট : ৩১ জুলাই, ২০১৮ ১১:১৫:৩২
বড়পুকুরিয়া কয়লা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কিসের কারসাজি
করীম রেজা


 


কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না। এবার কয়লার আরো দোষ পাওয়া গেল, যেমন কয়লা বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়, বাতাসে উড়ে যায়, আগুনে পুড়ে যায়, জলীয় বা®প হয়ে উড়ে যায়, কার্বন নষ্ট হয়ে যায়। বলেছেন বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কো¤পানি লিমিটেডের সদ্য অপসারিত এমডি। তার মতে, লোপাট কয়লা মূলত সিস্টেম লসের ফল। খনি বন্ধ হওয়ার আগে সিস্টেম লস বুঝতে পারেননি।  

৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২২ জুলাই রোববার রাত ১০টা থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। খনির একটি ফেস থেকে নতুন ফেসে যন্ত্রপাতি স্থানান্তরের জন্য ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। নতুন খনিতে পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবে আগস্ট মাসের শেষের দিকে।

খনি কর্তৃপক্ষ গত ২০ জুন পিডিবিকে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা মজুদের কথা নিশ্চিত করেন। কিন্তু মাত্র ১০ দিনেই ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যায়। পেট্রোবাংলা ও খনি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে কয়লার অভাবে কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার প্রাক্কালে।  যদিও এর আগে খনি কর্তৃপক্ষ এ সময়ের জন্য পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাস¤পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার জন্য পর্যাপ্ত কয়লার মজুদ রয়েছে বলে ২০ জুন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবিকে নিশ্চিত করে।  

জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা লোপাট করে আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার কমিটির দাখিলকৃত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বাণিজ্যিক উৎপাদন আরম্ভ করে। শুরু থেকে চলতি বছরের ২৭ জুন পর্যন্ত কয়লা উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার টন। এর মধ্যে ২০০৬ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয় ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার টন কয়লা।

এছাড়া ইটভাটাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয় ৩৩ লাখ ১৯ হাজার টন কয়লা। খনি কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ ব্যবহার করে ১২ হাজার টন। সিস্টেম লস দেখানো হয় ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। যার পরিমাণ উধাও হয়ে যাওয়া কয়লার সমপরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার টন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে পদ থেকে সরিয়ে চার জনের বিরুদ্ধে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ করা হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তের ভার দুদক পরিচালক কাজী শফিকুল আলমের নেতৃত্বে দুদককে দেয়া হয়েছে। দুদক আইন অনুযায়ী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে জানা গেল, ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও কখনোই ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন হয়নি। যে কোনো প্রকল্পেই কারিগরিভাবে ও  বাস্তবে তা হওয়া সম্ভব নয়। সারাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এই সূত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। কাগজপত্রে সরকারিভাবে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা প্রচার করা হয় বাস্তবে তা হয় কি-না এ প্রশ্ন জনমনে দেখা দিতে শুরু করেছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থিত নয়। চাহিদামতো কয়লার উৎপাদন এবং মজুদ আছে কি-না বিষয়টি অবহিত থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষে কঠিন এবং অসম্ভব কোনো কাজ ছিল না। নিজস্ব এলাকায় কয়লা মজুদের ন্যূনতম ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অবশ্য দায়িত্ব ছিল কয়লা খনির মজুদ স¤পর্কে খোঁজখবর রাখা। যৌথভাবে মজুদ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও করা যেত। তাহলে এই সম্ভাব্য সংকট আগে থেকেই আঁচ করা সম্ভব হতো। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করার প্রয়োজন হতো না।

বিশেষজ্ঞ মতামত জানাচ্ছে, এই কয়লা খনির উৎপাদন শেষ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। কয়লা বাইরে থেকে আমদানি, মজুদ ইত্যাদি বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিনির্ভর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মতো কয়লা উৎপাদন অসম্ভব; জানা সত্ত্বেও ২৭৫ মেগাওয়াটের আরেকটি জেনারেটর স্থাপিত হয় অজ্ঞাত কারণে।  

প্রকৃত জবাবদিহিতার অভাবে সবাই যার যার মতো করে প্রকল্প পছন্দ, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাটকল, সুতাকল, চিনিকল, ডকইয়ার্ড, ই¯পাত ও প্রকৌশল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান লাগাতার লোকসান দিয়ে বন্ধ হয়েছে। বনবিভাগ, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অনেক বিভাগেই দুর্নীতি পিছু হটছে না।  

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে কেন্দ্র করে কায়েমি স্বার্থবাদী দুর্নীতিবাজ একটি মহল গোড়া থেকেই সক্রিয় ছিল। ভারতের টাটা কো¤পানিকে কয়লা খনি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পাইয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা কম হয়নি। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে কয়লার মান উন্নত নয়, খনির মাটি ডেবে যাচ্ছে, কয়লা উত্তোলনে সমস্যা অনেক এবং ব্যয়বহুল, তার চাইতে আমদানি অধিক লাভজনক, বিদ্যুৎ ও খনি উভয়পক্ষ মিলেই এমন ধারা প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু টাটা কো¤পানি তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়ার পর এই অলাভজনক খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে তা দিয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। কয়লার মান, মাটি বা অন্যবিধ সমস্যাহীনভাবে লাভজনক।

তাছাড়া পরবর্তীকালে কয়লার সংস্থান ছাড়াই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্প্রসারিত হলো। কয়লা খনি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতিপরায়ণতা আগেও দেখা গেছে। ৩০০ কোটি টাকার হিসাব গরমিল হলে খনি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে ব্যাংক হিসাবে সেই টাকা জমা করেছিলেন।  শুরু থেকেই কয়লা খনি পরিচালনায় দুর্নীতি ছিল। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০০৫ সাল থেকে চলে আসা দুর্নীতির সবটুকু একসঙ্গে প্রকাশিত হলো। ধামাচাপা দেয়ার জন্য কিছু আইনজ্ঞ, জ্বালানিবিশারদ ও  বিশেষজ্ঞ নানান রকম ভারসাম্যহীন কথাবার্তা বলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন।

শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিতে রাস্তায় অনশন, কোটা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্তÑ এসব ঘটনা প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল। কিন্তু কোনো অদৃশ্য কারণে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে বাড়তে দেয়া হয়েছে, কার বা কাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য? এর আগের ঘটনা স্মরণ করা যায়, হাওর বিপর্যয়, বাংলাদেশ বিমানের নানান রকম ঘটনা, প্রতিবছর হজযাত্রীদের  দুর্ভোগ (এ বছর কিছুটা ব্যতিক্রম), সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘুদের ওপর নানাভাবে আক্রমণ, খাদ্য মজুদের ভুল তথ্য দিয়ে দেশে খাদ্য সংকটের চেষ্টা ইত্যাদি আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও মূল কিন্তু একসূত্রে গাঁথা।
উপর্যুক্ত ঘটনা তদন্তের ঘোষণা আছে। রিপোর্ট প্রকাশ বা শাস্তির কোনো সংবাদ গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নগুলো থেকেই গেল। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এসব ঘটনা জনসমক্ষে নিয়ে আসার পেছনে কোনো অপশক্তি ক্রিয়াশীল কি না জনমনে এ প্রশ্নও উঠেছে।

জবাবদিহিতার অভাবে প্রশাসন কর্তৃত্ববাদী  হয়, তা দেশ কিংবা জনগণ কারো জন্যই শুভ নয়। বিশেষত  সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের জন্য তা অশনিসংকেত হয়েও দেখা দিতে পারে। সরকারে থাকা উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ দলের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশের কথা প্রায়ই বলেন, বলেছেন। কাউয়া, হাইব্রিড প্রভৃতি বিশেষণ দিয়ে বলা হয়েছে। গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে এরা দলের ভেতরে আত্মগোপন করে দল এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তেমনিভাবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশাসনের বিভিন্নস্তরে আগের জোট সরকারের আমলে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। দল এবং প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা অপশক্তি চিহ্নিত হয়েছে এমন সংবাদ পত্রপত্রিকায় দেখা যায়নি। দলীয় জনসভায় কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্যই বোধ করি নেতানেত্রীরা বিষয়টি উচ্চারণ করেছেন। উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দায় এড়িয়েছেন। অপশক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে নিষ্ক্রিয় করা হলে আজকে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এত বড় বিপর্যয় সৃষ্টি হতো না । সরকারের ভাবমূর্তির এত বড় সংকট তৈরি হতো না। জবাবদিহিতা না থাকার কারণে লোভের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাছাড়া পরিকল্পনা করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এমন ঘটনার প্রকাশ সরকার ও দলের ভাবমূর্তির জন্য গভীর ষড়যন্ত্র ও হুমকিস্বরূপ।

উল্লিখিত সব ঘটনাকে একসূত্রে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ঘটনা বিচ্ছিন্নরূপে ঘটলেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার প্রভাব জনসাধারণের মনে কীভাবে স্থায়ী হয়েছে বা হতে পারে তা মনে রাখলে নির্বাচনকে সামনে রেখে একের পর এক এই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে যাবার উদ্দেশ্য সহজেই অনুমান করা যায়।

বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ কেড়েছে। বিভাগীয় মন্ত্রী কথা বলেছেন, সরব হয়েছেন উপদেষ্টাও। ভাবমূর্তি বিনাশের এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ ও প্রচার করা দরকার। তবেই জনসাধারণের মনে সরকারের প্রতি আস্থা আরো দৃঢ় হবে। সরকারের সক্ষমতা, প্রভাব সার্বিকভাবে বিস্তৃত হবে। যারা এ ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বা কৌশলে ঘটনা দীর্ঘায়িত করেছে, সেই দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে এমন উদ্দেশ্যে আর কেউ জড়িত হবার সাহস করবে না। অকারণে জাতীয় আকাক্সক্ষা ও জনগণ বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকাবে না। অশুভ শক্তি বারবার মাথাচাড়া দিতে ব্যর্থ হবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd