ঢাকা : বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা           কারও মুখের দিকে তাকিয়ে মনোনয়ন দেয়া হবে না : প্রধানমন্ত্রী          ২২তম অধিবেশন চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          দেশের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর, ২০১৮ ১৮:০০:০৯
‘প্রবীণদের সেবা দিন, নিজের বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিন’
বৃদ্ধাশ্রম নয়, অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকুক নিজ গৃহে
শাকিল হোসেন


 


যে পিতা-মাতার বদৌলতে আমাদের এ পৃথিবীর মুখ দেখা, আমাদের নিরাপদ শৈশব, কৈশোর, যৌবনকাল, এমনকি পরিণত বয়সেও আমাদের যারা ‘সাহারা’ বা অভিভাবক, সময়ের ব্যবধানে যখন তারা আজ প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে এবং আমরা সেই বয়সে, যে বয়সে তারা আমাদের দায়িত্বশীল পিতা-মাতা ছিলেন, তখন কি আমাদের একবারও স্মরণ হয় না, আমাদের জন্য কী কষ্টই না তারা করেছেন? আমরা যদি নিজ স্ত্রী-সন্তানের খুশির জন্য আজ তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাই, এই যে শিক্ষাটি আমরা আজ আমাদের সন্তানদের দিচ্ছি, কাল যখন আমরা বৃদ্ধ হব, তারা কি আমাদের পদাঙকই অনুসরণ করে আমাদেরও বৃদ্ধাশ্রমে বা শ্রমশিবিরে পাঠাবে না? এই তো সেদিন পত্রিকায় দেখলাম কোরিয়ায় এমন আইন করা হয়েছে যে, বৃদ্ধরা যতক্ষণ মৃত্যুবরণ না করছেন, ততক্ষণ তাদের কাজের মধ্যে থাকতে হবে। বার্ধক্যের প্রতি সত্যিই কি নিদারুণ পরিহাস!
আমি জেনে সত্যিই খুশি হয়েছি যে, ‘সভ্যতা’ এমনই এক সামাজিক উদ্যোগ, হতে পারে নবীন বা ক্ষুদ্র, যারা সমাজের মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাকুল কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে জড়ো করেছেন আর তাদের প্রধান উপলক্ষই হলো পারিবারিক মূল্যবোধ পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। তাদের অভীষ্ঠ স্বপ্ন, যা তারা ছাড়িয়ে দিতে চান সারা দেশে, তা’ হচ্ছে পিতা-মাতাকে সমীহ করা, তাদের বার্ধক্যকালীন অসহায় জীবনে ঠিক সেই সেবাযতœ ও দায়িত্ব পালন করা যে সেবাযতœ-দায়িত্ব নিয়ে অন্তর নিংড়ানো ¯েœহ দিয়ে তারা একদিন আমাদের আঁতুড় থেকে স্বাবলম্বী না হওয়া অবধি দায়িত্ব পালন করেছেন।
আজ থেকে অনেক বছর আগে ১৯২৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ‘শ্রম কমিশন’ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বা মজুরির একটি অংশ তাদের বার্ধক্যকালীন সঞ্চয় হিসাবে মঞ্জুরির বিধান করেন। এ প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় জীবনে পরিবারিক মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ভারতীয়রা তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হলেও এটি ধরে নেওয়া সঙ্গত হবে যে, মানুষ প্রথমে তার নিজের ও নিজ পরিবারের অভাব মোচনেই বেশি দায়িত্বশীল হয়ে থাকে। আজ আমরা আমাদের অতীতের পরিবারিক-সামাজিক সব মূল্যবোধ হারিয়ে বসে আছি। ছেলের স্মার্টফোন কিনে দিতে আমাদের অর্থাভাব হয় না; যত অভাব দৈন্য ঘটে বৃদ্ধ পিতা বা বিধবা মাতার ওষুধ কিনে দেওয়ার সময়। আর আচরণ ব্যবহারে রূঢ়তা এবং শিষ্টাচার-বহির্ভূত অকথ্য আচার ব্যবহারতো আছেই। এই ক’দিন আগে পত্রিকাতেই দেখেছি, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক অশীতিপর এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে হাসপাতাল নিয়ে যাচ্ছেন। সামান্য কয় হাত জমির দাবি না ছাড়ায় সহায়-সম্বলহীন বৃদ্ধা মাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে নিষ্ঠুর পুত্র। তা-ও আবার নিষ্ঠর পুত্র একা নয়, নিজে আর বউ মিলে বেধড়ক মেরে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে গেছে রোগজর্জর এই অশীতিপর বৃদ্ধাকে। হায়রে, মানবতার কী নিদারুণ অপমান! এই সব অনাচার-অবিচার থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক ও নিয়মানুগত জীবনযাপনের শুভবুদ্ধির ডাক দিয়েছে ‘সভ্যতা।’ তাই তাদের ডাকে সাড়া দেবেই মানবতাকামী দরদী মানুষ।
আমি ‘সভ্যতা’ সংগঠনের মহান ব্রতের একজন সহকর্মী, সহমর্মী। আমি ‘সভ্যতার’ সাফল্য ও অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য কামনা করছি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সেনসাস ডাটা (আদম শুমারি) তথ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী অন্যতম অঙ্গসংস্থাÑ পিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষের মতে, বর্তমানে গোটা মার্কিন জনগোষ্ঠীর ১৯ শতাংশ (প্রায় ৬ কোটি ৬ লাখ মানুষ) তিন প্রজন্মের পরিবারভুক্ত মানুষ (৩-এ ঋধসরষু) এক ছাদের নিচে বাস করে। জনসংখ্যার অনুপাতে এক সাথে বাস করা মানুষের এই গড় হার ২০০৯ ছিল ১৭% ভাগ; আর ২০১২ সালে ১৮% ভাগ। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা মানুষের হার কমছে বা এক সাথে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। অপরদিকে তৃতীয় বিশ্বে বার্ধক্যকালীন পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তাও যেমন যৎসামান্য; বৃদ্ধদের পরিবার-ছাড়া হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য হওয়ার হারও প্রতি বছর বাড়ছে। এশিয়ার আজকের এই অগ্রগতির মূলে রয়েছে এশিয়ার জনগণ। তাদের কর্মক্ষমতা কমেছে। অনেকেই বাধক্যজনিত কারণে বা রোগ-বিমারিতে বেকার ও অসহায়। অথচ সংসার ক্রমান্বয়ে সংকুচিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এশিয়ার সেই কর্মক্ষম মানুষেরা আজ কর্মহীন এবং অসহায়। এশিয়ার বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ইউরোপকেও ছাড়িয়ে গেছে, যা অসহায়ত্ব এবং বার্ধক্যের এমন একটি যোগসমষ্টিতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে মানবতার অসহায়ত্বই প্রকটভাবে ফুটে উঠছে।
১২টি এশীয় দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য প্রবণতা এবং একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে যেতে থাকায় রাষ্ট্রের উপর যে বাড়তি চাপ পড়ছে, তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চালিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এ সম্পর্কিত এক সমীক্ষায় বলেছে, সমাজে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব এই মহাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অভিযাত্রাকে পিছনের দিকে টেনে ধরছে। এই দুইটি তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই টেনে এনে আমার এই বিনীত বাণীর অনুসঙ্গ করেছি এই কথাটি বলার জন্য যে, ভঙ্গুর বা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হতে থাকা পরিবার আমাদের সময়ের ও সমাজের একটি মারাত্মক অবক্ষয়ের দিকনির্দেশ করছে। মার্কিনী বা ইউরোপীয়রা জ্ঞানী, তাই তারা আবার ফিরে যাচ্ছে একান্নবর্তী পরিবার কাঠামোয়। আমরা সেখানে ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটি সংসারকে অজস্র্র ভাগে ভাগ করার যেন এক ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় নেমেছি। এই স্বার্থপর প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আমাদের পূর্ববর্তী অর্থাৎ বাবা-মা-বড়বোন-বড় ভাই-চাচা-খালা-খালুরা, দাদা দাদি বা নানা নানিরা; আর দ্বিতীয় সর্বনাশটি ঘটছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, অর্থাৎ আজ যারা শিশু-কিশোর, তাদের জীবনে। এই অবহেলা দেখতে দেখতে বড় হওয়ার মধ্য দিয়ে।
স্বার্থপরতায় ছিন্ন-ভিন্ন ও সংকুচিত পরিবারে সব চেয়ে অবহেলিত হচ্ছে প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও শিশুরা। বাড়ছে অপরাধ, অবহেলার হাত ধরে সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে ভাঙ্গনের দিকে। নদী ভাঙ্গলে একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে। কিন্তু সংসার ভাঙ্গলে এ ভাঙ্গন বাড়তেই থাকে। সংসার জীবনে একুল ভাঙ্গলে, ওকুল আরো বেশি করে ভাঙ্গতে থাকে।
মুরুব্বিরা যেখানে সংসারের অভিভাবক হয়ে থাকার কথা, আজ তারা অবহেলিত। বৃদ্ধশ্রম বা অর্থের বিনিময়ে পেইং গেস্ট হিসেবে দুরাত্মীয় কোনো অভাবগ্রস্ত পরিবারে তাদের ঠাঁই হচ্ছে। এই সর্বনাশা মানবিক মূল্যবোধের ধস থামাতে এবং প্রবীণদের মর্যাদা ও যথার্থ যতœ-প্রযতœ দেখভাল নিশ্চিত করার মানসিক তাগিদ সৃষ্টিতে ‘সভ্যতা’ যে অভিনব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, আমি এজন্য তাদের আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই এবং তাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি।
অসহায় ও সুবিধা-বঞ্চিত প্রবীণদের জীবন সায়াহ্ন কালের যে নিঃসঙ্গতা ও অভাব-অনটন, এটা আজ সত্যিকার অর্থেই একটি ‘গ্লোবাল’ বা বৈশ্বিক সমস্যা। ব্যস্ত ও ‘আধুনিক’ জীবনের এরকমই এক মর্মবিদারক সমস্যা আগে যেমন ছিল শিল্পায়িত পাশ্চাত্যের সামাজিক সমস্যা, আজ তা’ যেন প্রাচ্যে বা আমাদের মতো দেশেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বরং বলা চলে, এখন অসহায় প্রবীণদের সমস্যা পাশ্চাত্যের চেয়ে প্রাচ্যেই বেশি। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুইডিশ সমাজবিজ্ঞানী গুনার মিরডাল তার বিখ্যাত ও বহুল-পঠিত ঞযব অংরধহ উৎধসধ গ্রন্থে এশীয় উৎপাদন রীতির আমূল পরিবর্তনের সাথে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সংগঠনের ত্রিভূজ সম্পর্কের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে যথার্থই লিখেছেন, এশিয়ার কৃষি নির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প-অর্থনীতিতে রাতারাতি উত্তরণের যে ঝড় বইছে তার প্রথম ও প্রধান অভিঘাত নেমে এসেছে ব্যক্তি ও পরিবার ব্যবস্থার উপর। অবহেলিত শৈশব এবং বঞ্চিত বার্ধক্য এশীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহ্যবাহী কৃষির স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় তথাকথিত শিল্প বিপ্লব আসলে মানবতার প্রতি ভোগবাদ ও উপযোগিতাবাদের এক নির্মম চাবুকাঘাত।
বর্তমানে রাষ্ট্র এমন একটি সামাজিক সংস্থায় রূপ নিয়েছে যা ওই ঐতিহ্যবাহী কৃষিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে ধনতন্ত্রে উত্তরণের বিপদগুলো মোকাবিলায় নিতান্তই অকার্যকর। রাষ্ট্র কাল্যাণবাদ পরিহার করে শুধু ভোগবাদী সমাজেরই প্রতিভূ হয়ে ওঠার এবং দমন কার্যকর করা ও রাজস্ব আয়ের মধ্যে সীমিত রাখছে তার ক্ষমতার দ-।
স্থানীয় প্রশাসন বা স্থানীয় সরকারও এখানে নিরূপায়। সেবা (ডবষভধৎব) যোগানোর মতো রাজস্বের হিস্যা স্থানীয় সরকার কাঠামোর পক্ষে আদায় করাও যেমন অসম্ভব; কল্যাণের উদ্যোগে তার অর্থায়ন ও সেবা কাঠামো পরিচালনা করার বিষয়টিও তেমনি কতকটা অবান্তর। রাষ্ট্র সংগঠন সমাজের অসহায় মানুষের জন্য কতটা কী করতে পারেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোও তার একটা জমাটমুটি গ্রহণযোগ্য মীমাংসা করে ফেলেছে। এখন আমাদের উচিত রাষ্ট্রকে অন্তত অসহায় জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব দূর করার জন্য একটি সুবিন্যস্ত সেবা কাঠামো গড়ে তোলা। দুই ডিজিটের মুদ্রাস্ফীতি ও শূন্য ডিজিটের সেবা কি কখনো এক সমীকরণে আসতে পারে? শূন্যের সাথে যাই কিছু যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ দিন না কেন, ফলাফল শূন্যের ঘরেই থাকে।
প্রবীণদের জন্য বীমা একটি ভালো উদ্যোগ। একটি সমাধান মুখী উদ্যোগও বটে। তাহলে অন্তত অসহায় বার্ধক্যের দিনে অপুষ্টি বা বিনা চিকিৎসায় তাদের অসহায়ত্বকে নির্মমভাবে অনুভূত হতে দেবে না। বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসতে হবে না। তাদের জন্য সমাজের দায়িত্বের চেয়েও বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে তাদের সন্তানদের। না হলে কী হবে জানেন? ওই গল্পের মতোই হবে। এক গুণধর পুত্র তার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে যাচ্ছে। তার ছেলে তাড়াতাড়ি কাপড় পরে বলল সে-ও যাবে। তার বাবা প্রশ্ন করলো- ‘তুমি কোথায় যাবে?’ বৃদ্বের নাতি উত্তর দিলÑ ‘আজ তুমি দাদাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছ আমি গিয়ে সেটা চিনে আসি।’ তার বাবা বললেন- ‘তুমি চিনে কি হবে?’ পুত্র উত্তর দিল ‘তুমি বুড়ো হলে তোমাকেও তো সেখানে রেখে আসতে হবে, তাই না!’ আশা করি এই সংলাপটি থেকে আমাদের বুঝার অনেক কিছু আছে। আমি অসহায় প্রবীণদের পক্ষে জনমত বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সভ্যতার’ এই উদ্যোগের সাফল্য কামনা করছি।
জীবনে বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের সংকট প্রতিটি মানুষকেই মোকাবিলা করতে হয়। যুগে যুগে, সমাজে সমাজে, প্রবীণ বা বয়ঃজ্যেষ্ঠদের অবস্থান সত্যিই এক বিচিত্র বিষয়। সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের সব আচার-আচরণেই পরিবর্তন এসেছে। পরিবারে, সংঘে, সমাজে, রাষ্ট্রে সকল পর্যায়েই এই সব আচার-আচরণে পরির্বতন দেখা যায়। তবে অনেক ব্যথা-বেদনায় সর্মাহত হই, যখন দেখি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে মানুষের যত অগ্রগতিই হোক না কেন, মানুষ অর্থাৎ সমকালীন মানুষ তাদের আগের প্রজন্মের মানুষকে অবহেলা, অবজ্ঞা ও তাদের দুরে রাখার এবং তাদের থেকে দুরে থাকার যেন এক তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমাদের ও পাশ্চাত্যের সমাজে সর্বত্র প্রায় একই চিত্র। আমাদের দেশে কিছুটা অভাব আর কিছুটা স্বাভাবের জন্য যেমন, বাইরের পৃথিবীতে শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি কেন্দ্রীকতার কারণে প্রবীণ জনগোষ্ঠী আজ অবহেলার পাত্র। শেষ জীবনে ঠাঁই হচ্ছে কারো দয়া-দাক্ষিণ্যের কাছে কিংবা কোনো বৃদ্ধাশ্রমে। এইতো ‘বর্ণাঢ্য’ জীবনের নিষ্ঠুর শেষ পরিণতি!
‘সভ্যতা’ এমন এক উদ্যোগ, যার সাথে সহানুভূতি বা সহমর্মিতা না জানিয়ে পারা যায় না। কারণ, যতদূর জেনেছি, ‘সভ্যতা’ নামের এই উদ্যোগ সভ্যতাকে পরিহাস করা প্রবীণদের করুণ জীবনের যে পরিণতি, সেই মর্মবিদারক সামাজিক অবক্ষয় থেকে বার্ধক্যকে তার যথাযোগ্য স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনার ডাক দিচ্ছে। আমি জেনে আরো খুশী হয়েছি যে, ‘সভ্যতা’ একটি সামাজিক সচেতনতার জন্য কাজ করছে, যার প্রধান উপলক্ষ্যই হলো সমাজের অসহায় প্রবীণ জনগোষ্ঠী।
আমি এ প্রসঙ্গে মানবতার দিশারী, বঙ্গবন্ধু-কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি এ জন্য যে, তাঁর উদ্যোগে সন্তানের বৃদ্ধ পিতা-মাতার দেখাশোনা করার দায়দায়িত্ব আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে সন্তান পিতা-মাতার ভরণ পোষণ না দিলে এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিল সংসদে পাস হয়েছে। জাতীয় সংসদে এতদসংক্রান্ত বিলটি সর্বসম্মতভাবে কণ্ঠভোটে পাস হয়। সমাজে বৃদ্ধ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে এই উদ্বেগ এবং এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। আমি ‘সভ্যতার’ প্রবীণবান্ধব উদ্যোগকে ব্যক্তিগতভাবে এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবস্থান থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি, বিশেষত এ জন্য যে, উদ্যোক্তারা বয়সে তরুণ হয়েও পরিণত জীবনে অবহেলার এই গ্লানিকে অনুভব করতে পেরেছেন। তাদের এই মানবিক মূল্যবোধ সবারই সহানুভূতি ও সহমর্মিতার দাবি রাখে।
লেখক : সিইও, সভ্যতা  

printer
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয় পাতার আরো খবর

Developed by orangebd