ঢাকা : শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • দ্বীপ ও চরাঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে ইন্টারনেট          দুদকের মামলায় সম্রাটের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর          এয়ার শো’তে যোগ দিতে দুবাইয়ে প্রধানমন্ত্রী           সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে : স্পিকার          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর, ২০১৮ ১৭:০৭:৪৮
মবিল সন্ত্রাস : পদক্ষেপ এখনই
নজরুল মৃধা


 


পোড়া মবিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরে পস্তাতে হতে পারে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই অপরাধগুলো সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ হওয়ার আগেই তা কেটে ফেলা উচিত। তা না হলে আগামীতে অন্য কোনো আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। তাই সময় থাকতে আন্দোলনের নামে যারা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা এবং হয়রানি করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
গত ৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন। এই আইনের সংশোধনসহ সাত দফা দাবিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘট পালনের নামে যা হয়েছে তা  কোনো সভ্য সমাজই কোনোদিনই মেনে নিবে না। দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন হতেই পারে। তবে তা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এবং গঠনমূলকভাবে। কিন্তু দাবি আদায়ের নামে যদি উচ্ছৃঙ্খল আচরণ কিংবা কাউকে হেনস্তা করা হয় তখন এটি আন্দোলন থাকে না। তখন এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় অপরাধ। আর অপরাধ করলে তাকে শাস্তির আওতায় আসতে হবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।  
গণমাধ্যমে খবর এসেছে, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ৩৮ ছাত্রীকে বাড়ি পাঠানোর জন্য কলেজ বাসে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খলতার হাত থেকে রেহাই পাননি ছাত্রীরা। বাস আটকে চালক ও হেলপারের মুখে পোড়া মবিল লাগিয়ে দেয় তারা। ছাত্রীদের অনেকের গায়েও পোড়া মবিল ছুঁড়ে মারা হয় এবং তাদের গালিগালাজ করা হয়। এধরনের ঘটনা শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়- দেশের অনেক স্থানেই ধর্মঘটের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে। অনেকে লোকলজ্জা এবং নিজের মান-সম্মানের ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি। এই হয়রানির বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত খতিয়ে দেখা উচিত।  এবিষয়ে যদি সময় মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তা হলে এ থেকে উৎসাহিত হয়ে আগামীতে আরো বড় ধরনের অপরাধ ঘটে যেতে পারে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হবে।
পোড়া মবিলের পাশাপাশি সারাদেশে ধর্মঘটের সময় রাস্তায় নামা ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকদের হযরানি করতে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থেকে নামিয়ে চালকদের কান ধরে ওঠবোস করানোর খবর এসেছে গণমাধ্যমে। চোখ বন্ধ করে একটু ভাবলেই এসব ঘটনায় শিউরে উঠতে হয়। যাকে কান ধরে উঠবোস করানো হলো তিনি কি এই দুঃসহ স্মৃতি কোনো দিন ভুলতে পারবেন? যতদিন বেঁচে থাকবেন তাকে এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে। অথচ তার কোনো অপরাধই ছিল না। যারা এটি করল তারাও রয়ে গেল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
সড়ক পরিবহনের নতুন আইনে বলা হয়েছে, চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সহকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস ও পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের বয়স আগের নিয়মে ১৮ বছর বয়স এবং শুধু পেশাদার চালকের বয়স ২১ রাখা হয়েছে।  ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে অনধিক ছয় মাসের জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ- দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে। এই দ-ের আসামিকে বিনা পরোয়ানায় পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে। সহকারীকেও এক মাসের জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। নতুন নিয়মে চালক মোবাইলফোন ব্যবহার করতে পারবে না। এই আইন না মানলে কারাদ-সহ ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। বিধি অমান্য করলে চালকের পয়েন্ট কাটা যাবে। ১২টি পয়েন্ট দেওয়া হবে, পয়েন্ট শূন্য হয়ে গেলেই চালকের লাইসেন্স বাতিল হবে। আইনে আরো বলা হয়েছে, নরহত্যা হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদ-। হত্যা না হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদ- বিধান করা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী তিন বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।
অন্য দিকে এই আইনের বিরোধিতা করে পরিবহন শ্রমিকরা দাবি তুলেছে, সড়ক  দুর্ঘটনার মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে। শ্রমিকদের অর্থদ- ৫ লাখ টাকা থেকে কমাতে হবে। দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখার দাবি তোলা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি। ওয়েস্কেলে (ট্রাক ওজন স্কেল) জরিমানা কমানোসহ শাস্তি বাতিলের দাবি করা হয়েছে। এছাড়া সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ, গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকদের নিয়োগগপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করার দাবি তোলা হয়।
শ্রমিকদের এসব দাবির বিষয়ে সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আইন সংশোধনের জন্য আগামী সংসদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এ সরকারের আমলে এই আইন সংশোধনের আর সময় নেই। নির্বাচনের পর পরবর্তী সরকার যদি মনে করে আইন সংশোধনের যৌক্তিকতা রয়েছে তা হলেই এই আইন সংশোধন হতে পারে।
অপর দিকে গণমাধ্যমে খবর এসেছে শ্রমিকদের ধর্মঘটের বিষয়ে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অর্থাৎ ধর্মঘটের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোনো মন্তব্যই করেননি।
তাই শ্রমিকদের এই ধর্মঘটের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে বলতে শোনা গেছে, সরকারের পরোক্ষ ছায়ায় এই ধর্মঘট হয়েছে। সরকারের ইচ্ছা কিংবা শ্রমিকদের স্বত্বঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই ধর্মঘট হয়েছে সেটা বড় বিষয় নয়। বিষয় হলো- ধর্মঘটের নামে হলোটা কি? ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল নিক্ষেপ, ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিককে নামিয়ে কান ধরে উঠবোস করাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।  যা কোনো দিন কাম্য কিংবা কারো ধারণাতে ছিল না- তাই হয়েছে ধর্মঘটের নামে। এসব অরাজকতাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যারা এসব কুকীর্তি করেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করা না হয় তা হলে আগামীতে আন্দোলনের নামে এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শ্রমিক আন্দোলনের নৈরাজ্যের শিকার যারা হয়েছেন তাদের স্বস্থির জন্য হলেও মবিল সন্ত্রাসীসহ অন্যদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
লেখক : কবি-সাংবাদিক

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd