ঢাকা : শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : সিইসি          নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই : সিইসি          দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০৯:২৮:৫৪
জননী সাহসিকা স্মরণে
দিলরুবা খান


 


আজ ২০ নভেম্বর দেশের সব গণতান্ত্রিক মানবিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব¡, নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রসেনানী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা, সভানেত্রী বেগম সুফিয়া কামালের ১৯তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের এইদিনে তার মহাপ্রয়াণ ঘটে।

১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন তিনি। বাবা সৈয়দ আবদুল বারী এবং মা নওয়াবজাদি সৈয়দা সাবেরা খাতুন। স্বামী কামাল উদ্দিন।
সুুফিয়া কামালের পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। সেই সময় মেয়েদের বাংলা পড়তে দেয়া হতো না। সুফিয়া কামালের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঘর থেকেই। মায়ের কাছে বাংলা শিখেছেন। বাড়িতে মামা খোদাবক্সের ছিল বিশাল লাইব্রেরি। আর তাতে বিভিন্ন ভাষার বই ছাড়াও ছিল দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা আর ম্যাগাজিনের ছড়াছড়ি। লাইব্রেরিতে আসত প্রবাসী এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকা, যা থেকেই সুফিয়া কামালের ভেতরে লেখালেখির সুদৃঢ় ইচ্ছা- তিনি লিখতে পারবেন। তার এ বিশ্বাস থেকেই মাত্র ১০/১১ বছর বয়সেই তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। লেখা ছাপার কারণে তার মামা ভীষণ রেগে যান। শুধু তাই নয়, শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের কঠোর অবরোধ প্রথার জন্য তার স্কুলেও যাওয়া হয়নি। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর শায়েস্তাবাদ ছেড়ে তিনি স্বামীর সঙ্গে বরিশাল চলে আসেন। স্বামীর সহযোগিতায় তার শিক্ষা এবং কাব্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। সেই সময় ‘তরুণ’ নামে একটি পত্রিকায় পত্রিকায় সুফিয়া কামালের একটি ছোটগল্প ‘সৈনিক বন্ধু’ ছাপা হয়েছিল। তার প্রথম কবিতা বর্ষা। এ গল্প ও কবিতা ৭/৮ বছর বয়সে লেখা হলেও ছাপা হয় বিয়ের পর। পত্রিকায় গল্প-কবিতা ছাপা নিয়ে পরিবারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এবং গঞ্জনাও সইতে হয় তাকে। এরপর স্বামী মারা গেলে তার সঙ্গে পারিবারিক অসহযোগিতাও শুরু হয়। তিনি মা ও শিশুকন্যাসহ কলকাতায় চলে আসেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি নিলেন কলকাতা করোনেশন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি। নিজেকে তৈরি করে নিলেন কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে। নতুন করে মনোনিবেশ করলেন সাহিত্যচর্চায়। দিনে খুব একটা সময় পেতেন না। বেশিরভাগ লেখাই লিখেছেন রাতে।

সাহিত্য জগতে জায়গা করে নেয়ার পেছনে যাদের অবদান তারা হলেনÑ কাজী নজরুল ইসলাম ও সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। নাসির উদ্দীন তার মধ্যে আবিষ্কার করলেন যথার্থ কাব্য প্রতিভার। তিনি শুধু সুফিয়া কামালের কবিতাই ছাপেন তা নয়, মহিলা সংখ্যা সওগাতে ছেপে দেন তার ছবি। সে সময় এটা ছিল বিস্ময়কর ঘটনা। ১৯৪৭ সালে বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করলে নাসির উদ্দীন তার ওপর বেগম সম্পাদনার ভার দিলেন। তার প্রথম কবিতা সাঁঝের মায়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে উপহার পাঠালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করেছে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং নিশ্চিত তোমার প্রতিষ্ঠা।’

বিশ্বকবির এ আশা সত্যি হয়েছিল। সুফিয়া কামালের লেখা কবিতা ও গল্প রাশিয়া এবং আমেরিকায় অনুদিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনুবাদ হয়। কিশোর বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন।

সুফিয়া কামালই ছিলেন সে যুগের প্রথম বাঙালি মুসলমান নারী, যিনি সমাজের নিন্দা উপেক্ষা করে পাইলটের সঙ্গে বিমানে চড়েছিলেন। মাত্র ১৩/১৪ বছর বয়সেই তিনি মাতৃমঙ্গল সমিতি গঠন করেন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম গঠন করেন। ওয়ারী মহিলা সমিতি, নারী পুনর্বাসন সংস্থা, বেগম ক্লাব, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, ছায়ানট প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। ছায়ানট ও বাংলাদেশ সোভিয়েট মৈত্রী সমিতির দীর্ঘদিন সভাপতিত্ব করেছেন। কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৫২ সারের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পুরস্কার পান, যা তিনি ছাত্র আন্দোলনের সময় ফিরিয়ে দেন।

সুফিয়া কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান। তিনি যেসব পুরস্কার পেয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭৬ সালে নূরুননেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী পুরস্কার, ১৯৭৬ সালে নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক, শেরে-বাংলা জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- ১৯৭০ সালে রাশিয়া থেকে লেনিন পুরস্কার, ১৯৮১ সালে চেকোশ্লোভাকিয়া সংগ্রামী নারী পরিষদ পুরস্কার। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেম্বার অব কংগ্রেস পুরস্কার এবং ক্লাব অব বোস্টন সনদ। সুুফিয়া কামালের উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে-কেয়ার কাঁটা, সোভিয়েটের দিনগুলি, মায়া কাজল, একালে আমাদের কাল, সাঁঝের মায়া, উন্মুক্ত পৃথিবী, মন ও জীবন, প্রশান্তি ও প্রার্থনা, দিওয়ান, মৃত্তিকার ঘ্রাণ, স্ব^নির্বাচিত কবিতা, ইতল বিতল, নওল কিশোরের দরবারে ইত্যাদি।

সবশেষে আবারও বলবো, দেশের ক্রান্তিলগ্নে জাতির সংকটে বাতিঘরের মতো বাংলাদেশের মানুষকে যিনি আলোর পথ দেখিয়েছেন সব কুশংস্কার ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদাায়িকতার বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন সোচ্চার। মহাপ্রয়াণ দিবসে  তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।  আজ মঙ্গলবার সুফিয়া কামালের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচির মধ্যদিয়ে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

Developed by orangebd