ঢাকা : শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর, ২০১৮ ১৫:১০:৫৮
দশম সংসদের পাঁচ বছর
সিরাজুজ্জামান

 

চলমান জাতীয় সংসদের পাঁচ বছরে প্রায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় করেও কোনো সংসদীয় কমিটির বৈঠকেই এমপিদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। গড়ে প্রতিটি বৈঠকে সদস্যদের অর্ধেকের বেশি উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি মাসে যতগুলো বৈঠক করার কথা ছিল তাও করতে পারেনি কমিটিগুলো। নেই সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো ‘সুনির্দিষ্ট’ হিসাব। সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তাদের অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। এসব কারণে সরকারের কাজে জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটিগুলোরই অবস্থা ছিল নড়বড়ে। জানা যায়, ১১টি সংসদীয় কমিটি এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসহ মোট ৫০টি কমিটি রয়েছে সংসদে।  গত পাঁচ বছরে ২৫ হাজার ৪৯৪টি সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ করেছে কমিটিগুলো । কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে। তবে সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে মন্ত্রণালয় কাগজে কলমে দেখিয়েছে- প্রায় সব সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু জাগো নিউজের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে এসব সুপারিশের অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, এখানকার এমপিদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এছাড়া ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। এদের অধিকাংশেরই প্রধান লক্ষ্য টাকা আয় রোজগার করা। তাই সংসদের প্রতি তাদের নজর কম। বেশির ভাগ এমপিই ফাইল নিয়ে সচিবালয়ে দৌঁড়ায়। কমিটির খরচ প্রায় ১০ কোটি টাকা জাতীয় সংসদের সহকারী সচিব ফারহানা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দশম জাতীয় সংসদ গঠনের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সংসদীয় কমিটিগুলো ৩ হাজাার ২ শত ২৫ টি বৈঠকে করছে।  আর সংসদের লাইরব্রেরিতে রাখা ২০১৭ ও ২০৮ সালের সাপ্তাহিক বুলেটিন থেকে সংসদীয় কমিটিগুলোর বৈঠকের হাজিরা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কমিটির সদস্য সংখ্যা ১০ জন হলেও গড়ে ৬ জন করে উপস্থিত থেকেছেন তারা।  সংসদ-সদস্য (পারিতোষিক ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৭৩ ( মে ২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী একজন এমপি সংসদীয় কমিটিতে উপস্থিত থাকলে যাতায়াত বাবদ কিলোমিটার (সড়ক পথে) প্রতি ১০ টাকা করে পান। এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার সময় যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয় সেই ঠিকানা অনুযায়ী তারা যাতায়াত ভাড়া পান । যে এলাকা থেকে নির্বাচিত তিনি সেই এলাকার ঠিকানা শপথের সময় ব্যবহার করা হয় । সংসদের হিসাব শাখা জানায়, বৈঠকে উপস্থিতির জন্য গড়ে ২ হাজার টাকা করে তুলেছেন এমপিরা। গড়ে ৬ জন করে উপস্থিতি ধরে এতগুলো বৈঠকের যাতায়াত বাবদ সংসদের খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ।  বৈঠকে হাজিরার জন্য এমপিদের ১ হাজার করে টাকা দেয়া হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী গড়ে ৬ জন হারে তাদের  পেছনে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিটি বৈঠকে এমপিরা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, সংসদের কর্মকর্তাসহ ৬০ জনের নাস্তা নির্ধারিত রয়েছে। নাস্তা বাবদ জনপ্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দ হিসেবে প্রতিটি বৈঠকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়।সেই হিসেবে গত পাঁচ বছরে নাস্তার পেছনেই খরচ হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সংসদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিসহ বিভিন্ন খরচ মিলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে হিসাব শাখা জানায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত টাকা খরচ করেও তাদের সংসদে টানতে না পারায় আইনের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা না থাকলেও ঐতিহ্যগত জায়গায় দশম সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি বলেন, আইন মানুষ তৈরি করে, রীতি-নীতিও মানুষের কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি হয়। কোনোটিরই মূল্যই কম নয়। আমি আশা করি সবার অংশগ্রহণে আগামী সংসদ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে।    
কমিটির বৈঠকে উপস্থিতি গড়ে অর্ধেক
কমিটিগুলো বৈঠকে উপস্থিতি দেখতে সংসদের লাইব্রেরিতে রাখা সাপ্তাহিক বুলেটিগুলো পর্যালোচনা করা হয়। ২০১৭ সালের জানুযারি  থেকে ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর বৈঠকের উপস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,  কোনটিতেই শতভাগ হাজিরা নেই।
সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির সভাপতি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সেখানে সদস্য হিসেবে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়েছেন। এজন্য এই কমিটির বৈঠকে তুলনামুলক উপস্থিতি বেশি। সংসদের অধিবেশনে কি কি হবে, কত দিন চলবে এসংক্রান্ত কাজ নির্ধারণ করা ১৫ সদস্যের এই কমিটিতে এই সমযে ৮টি বৈঠকে ১টিতেও   শতভাগ উপস্থিত নেই । সর্বোচ্চ উপস্থিতি ১৬ তম, ১৭ ও ২২তম বৈঠকে ১২ জন, এবং ১৮, ১৯ ও ২১ তম বৈঠকে ১১ জন করে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কার্যউপদেষ্টা কমিটির ১৫তম বৈঠকে ১০ জন, ২০তম বৈঠক ১০ জন উপস্থিত ছিলেন। শত বৈঠক করেছে দাবি করা সরকারির হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৫ জন হলেও কোনো কমিটিতে সব সদস্য উপস্থিত হতে পারেননি। এই বছর এই কমিটির ‘অনুষ্ঠিত’ ৯৫, ৯৬ ও ৯৭ তম বৈঠকে কোনো তথ্য বুলেটিনে নেই।  দশম সংসদের পাঁচ বছর
নিয়ম মেনে বৈঠক করা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী এই বছর ৭ অক্টেবর পর্যন্ত ৫৮টি বৈঠকে করেছে। এই কমিটি এই সময়ে ৯টি বৈঠকে । এর ৫০তম বৈঠকে ৬ জন, ৫১তম  এ ৬জন, ৫২তম এ ৭ জন,  ৫৩তম  এ ৭ জন,  ৫৪তম এ  ৬ জন, ৫৫তম এ ৪ জন,  ৫৬তম এ ৭ জন,  ৫৭তম এ ৫ জন  ও ৫৮তম বৈঠক এ ৮ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মত গুরুত্বপূর্ন কমিটি এই সময়ে মাত্র তিনটি বৈঠকে করেছে। এই সময়ে ২৩তম বৈঠক এ ৫ জন, ২৪তম এ ৬ জন ২৫তম এ ও ৫ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন। এই কমিটির সভাপতি সাবেক খাদ্য মন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক (টাঙ্গাইল-১)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি গত পাঁচ বছরে মাত্র ২৩ টি বৈঠক করেছে। উপস্থিতিও হতাশাজনক। এর ১৯তম বৈঠক ৬ জন, ২০তম এ ৫জন, ২১তম এ ৫ জন এবং ২২ ও ২৩ তম বৈঠকে ৭ জন করে এমপি  উপস্থিত ছিলেন। এই কমিটির সভাপতি আওয়ামী লীগের টিপ মুন্সি (রংপুর-৪)।  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মত কমিটি এই পাঁচ বছরে মাত্র ২৯টি বৈঠক করেছে। এই বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র দুটি বৈঠক করেছে এই কমিটি। তাই ১০জনকে হাজির করতে পারেনি। এর ২৮তম বৈঠক ৭ জন ও ২৯তম বৈঠকে ৯ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন।  বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভা এই সময়ে মাত্র ৪টি বৈঠক করেছে। এর ২৪তম বৈঠক ৬ জন, ২৫ম এ ৫ জন, ২৬তম এ ৬ জন এবং ২৭তম ৮ জন উপস্থিত ছিলেন। অন্য সব কমিটিগুলোর চিত্র একই । এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বৈঠকে যে সকল বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তা সংসদে যায়। তাই সংসদীয় কমিটির বৈঠকেগুলোতে উপস্থিত থেকে আলোচনা অংশ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মন্ত্রী পরিষদের বৈঠনে যদি কোন আইন প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনা করা হয় তবে, অবশ্যই উপস্থিত থাকা দরকার। তা না হলে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে কাযকরি ভুমিকা পালন করার যাবে না। আইন প্রণয়ন ছাড়া অন্যান্য বিষয় হলে উপস্থিত না থাকতে পারলে আলোচনা করে নিলেও হবে।
সুপারিশ বাস্তবায়ন
জাতীয় সংসদের সহকারী সচিব ফারহানা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদন  উল্লেখ করা হয় দশম জাতীয় সংসদ গঠনের পর ২০০৯ সালের  জানুয়ারি  থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত  ২৫ হাজার ৪৯৪টি সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ করেছে কমিটিগুলো । কিন্তু কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের হিসাব এককভাবে কোথাও নেই।  কমিটির বৈঠকের কার্যপত্রে সুপারিশ ও বাস্তবায়নের প্রতিবেদন ও সংসদে উত্থাপিত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখো গেছে এর অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়নি।  এ নিয়ে সরকারি দলের এমপি ও সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর এই কমিটি তাদের ২১ তম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের খোয়া যাওয়া সমুদয় টাকা ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল। ২০১৬ সালের ১০ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সুপারিশ করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ওই একই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা খোয়া যাওয়া নিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ আরো ৪টি সুপারিশ ছিল। এর একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এই কমিটির সভাপতি সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। তার বাড়ি শরিয়তপুরের নড়িয়া থানায়। তিনি প্রায় প্রতিটি বৈঠকে নড়িয়ার নদী ভাঙ্গন রোধ করার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো ব্যবস্থা না নেয়া ভয়াবহ নদী ভাঙ্গনের কবলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠির ঘরবাড়ি নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির শওকল আলী বলেন, সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতিদের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তা হয়নি। এটা আমাদের জন্য একটি দুর্ভাগ্য। এজন্য অনেক কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিরও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য অনেকে বৈঠকেই প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে অন্য কথা! সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২৪ তম বৈঠকে উত্থাপিত সুপারিশ ও বাস্তবানয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-বর্তমান সংসদের গঠনের পর ১৫৫টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে জননিরাপত্তা বিভাগ সংশ্লিষ্ট সুপারিশ হল ৯৬টি। এর মধ্যে ৮৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এই ৮৫টির ৩৪টি সিদ্ধান্ত চলমান থাকবে। আর বাস্তবায়নের জন্য চলমান ৮টি। আর ৩টি আপাতত বাস্তবায়ন যোগ্য নয় বলে মন্ত্রণালয় জানায়।
সংসদীয় কমিটিগুলোর সাচিবিক দায়িত্বপালনকারী একাধিকা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের শেষ সময়ে কে আর পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যাবে। আর নতুন সংসদে সব কিছু নতুন করে শুরু হবে। তাই যে ভাবে পারছে সুপারিশ বাস্তবায়নের হার দেখাচ্ছে।
অধিকাংশ কমিটি নিয়ম মানেনি
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটিগুলো প্রতি মাসে ১টি করে বৈঠক করার নিয়ম রয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেকটি কমিটিকে কমপক্ষে মাসে ২টি করে বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন । মাসে একটি করে বৈঠক করলে গত সাড়ে চার বছরে প্রত্যেকটি কমিটির কমপক্ষে ৫৮টি বৈঠক হওয়ার কথা । কিন্তু মাত্র ২টি কমিটি এটি প্রতিপালন করতে পেরেছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিধি মেনে এই সময়ের মধ্যে ১০৪ টি বৈঠকে করেছে।
সবচেয়ে কম বৈঠক করেছে বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি।এটি মাত্র ৫ টি বৈঠক করেছে।  সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রত্যেকটি কমিটি বছরে একটি করে প্রতিবেদন দেয়ার রয়েছে। কিন্তু কোনো কমিটিই তা পালন করেনি। অধিকাংশ কমিটি কোনো প্রতিবেদনই দেয়নি। এসব বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এমপিদের প্রধান কাজই হল সংসদীয় কাজে অংশ নেয়া। কিন্তু অনেক সময় এর ব্যত্যয় দেখা যায়। এটি ঠিক নয়। এজন্য এমপিদের জন্য বিশেষ ট্রেনিং নেয়া দরকার, যাতে তারা বেশি করে সংসদীয় কাজে মনোযোগী হয়।
স্বাধীনতার পর ১৪১৪ আইন পাস
স্বাধীনতার পর ১০টি সংসদের ২৫৭০ কার্য দিবস সংসদ চলেছে। আর এই সময়ে পাস হয়েছে ১৪১৪টি আইন । এমপিদের প্রধান কাজ আইন তৈরি করা হলেও মন্ত্রীদের ছাড়া এমপিদের আনা আইনগুলো পাত্তা পায়নি সংসদে। তাই  স্বাধীনতার পর ২৭৩ বেসরকারি বিল বা আইন উত্থাপন হলেও পাস মাত্র ৯ টি।  আর দশম সংসদে এমপিদের একটি আইনও পাস হয়নি। এর মধ্যে সংবিধানের সংশোধী আনা হয়েছে ১৭ বার। সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহীত হয়েছে ২৩টি। তবে ধন্যবাদ প্রস্তাবের নামে ব্যক্তি বন্দনা হয়েছে ৮ বার। বিদায়ী সংসদেই পাস হয়েছে ১৯৩টি আইন। বিরোধী দলীয় এমপিদের আনা সংশোধনী গ্রহণ দশম সংসদের পাঁচ বছর
করা হয়েছে মাত্র কয়েকটি আইনে। স্বাধীনতার পর সংসদের ২৫৭০ কার্য দিবসে ১৪১৪ আইন পাস স্বাধীনতার পর সংসদ চলেছে ২৫৭০। এই কয়দিনে আইন পাস হয়েছে ১৪১৪টি। দুই দিনে প্রায় একটি করে আইন পাস হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদে ২৩ টি অধিবেশন ১৯৩টি আইন পাস হয়। এসব পাস হওয়া আইন ও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।  সূত্র জানায়, প্রথম সংসদের (৭-০৪-১৯৭৩ হতে ০৬-১১-৭৫ পর্যন্ত) মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস। এ সংসদের কার্যদিবস ছিল ১৩৪টি। এই সময়ে ১৫৪টি আইন পাস হয়। দিনে একটিরও বেশি করে আইন পাস হয়েছে। যা বিগত সংসদের কোনোটিতেই এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি। স্বাধীনতার পর নতুন আইনের দরকার ছিল বলেই এতগুলো আইন পাস হয়েছে বলে সংসদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।  এছাড়া দ্বিতীয় সংসদের মেয়াদ ২ বছর ১১ মাস ছিল (০২-০৪-৭৯ হতে ২৪-০৩-৮২)। এই সংসদের কার্যদিবস ২০৬টি। আইন পাস হয়েছে ৬৫টি।  তৃতীয় সংসদের ১ বছর ৫ মাস (১০-০৭-৮৬ হতে ০৬-১২-৮৭) । কার্যদিবস ছিল ৭৫টি। আইন পাস হয়েছে ৩৯টি।  চতুর্থ সংসদের ২ বছর ৭ মাস (১৫-০৪-৮৮ হতে ০৬-১২-৯০ পর্যন্ত)। কার্যদিবস ১৬৮ টি। আইন পাস হয়েছে ১৪২ টি। পঞ্চম সংসদের মেয়াদ ছিল ৪ বছর ০৮ মাস (০৫-০৪-৯১ হতে ২৪-১১-৯৫ পর্যন্ত) কার্য দিবস ছিল ৪০০টি।  আইন পাস হয়েছে ১৭৩টি। ষষ্ঠ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন (১৯-০৩-৯৬ হতে ৩০-০৩-৯৬)। এর কার্যদিবস ছিল ৪দিন। এসময় সংবিধান সংশোধ করে  নির্দলয়ী তত্ত্বাবধায়স সরকার ব্যবস্থা আনা হয়। এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন ছাড়া আর কোনো আইন পাস হয়নি।
সপ্তম সংসদের মেয়াদ ছিল পূর্ণ ৫ বছর । (১৪-০৭-৯৬ হতে ১৩-০৭-০১) কার্যদিবস ৩৮২টি। আইন পাস হয়েছে ১৯১টি। অষ্টম সংসদের মেয়াদও পূর্ণ ৫ বছর ছিল। (২৮-১০-০১ হতে ২৭-১০-০৬)। কার্যদিবস ছিল ৩৭৩টি। আইন পাস হয়েছে ১৮৫টি। নবম সংসদের মেয়াদ ছিল পূর্ণ ৫ বছর (২৫-০১-০৯ হতে ২৪-০১-১৪ পর্যন্ত)। কার্যদিবস ছিল ৪১৮টি । আইন পাস হয়েছে ২৭১ টি।  
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের দেশে সরকার খুব সহজে আইন করে পাশ করে। আমরা দেখেছি ব্রিটিশ আমলে যখন একটা আইন হতো, তখন প্যানালকোর্ট, ক্রিমিনাল প্রোসিডিওর কোড (সিআরপিসি), সিভিল প্রসিডিউর কোড (সিপিসি)- দীর্ঘ দিন এই আইনগুলো আছে তার কিন্তু তার কোন রকম সংশোধনের প্রয়োজন মনে করে না, রেয়ার সংশোধন। বাংলাদেশ হওয়ার পরে আমাদের পার্লামেন্ট অনেক আইন পাস করেছেন। আইনগুলো পাস করার আগে “ল” কমিশনের থেকে উচিত আলোচনা পর্যালোচনা এবং পরামর্শ করা দরাকর। বিভিন্ন ভাবে আইন পাশ করতে দীর্ঘ সময় দরকার হয়। কিন্তু আমাদের দেশে আইন পাশ করে খুব অল্প সময়ে। তার পরে একটা আইন পাস করলে সেটা বার বার সংশোধন করতে হয়। সর্বোপরি যে উদ্দেশ্য আইন পাস করা হয় তাতে মামলার সংখ্যা বাড়ানো হয়। কিন্তু যাদের জন্য আইন করা হয়, (দেশের সাধারণ নাগরিক) তারা সুযোগ পান না।
বিল পাস
স্বাধীনতার পর ২৭৩ বেসরকারি বিল উত্থাপন; পাস মাত্র ৯টি। সূত্র জানায়, বর্তমান সংসদে মন্ত্রী ছাড়া এমপিরা সরাসরি ১৬ বিল আনলেও একটিও পাস হয়নি। শুধু এই সংসদ কেন বিগত ৯টি সংসদের এমপিদের বিলগুলো পাসের নজির কম। দশটি সংসদে এ পর্যন্ত ২৭৩টি বিল আসলেও  পাস হয়েছে মাত্র ৯টি। প্রথম সংসদে এধরনের কোনো বিল পাওয়া  যায়নি। তবে ৫ম জাতীয় সংসদে সবচেয়ে বেশি আনা হয়েছিল। এ সংসদে ৭৪টি আনা হলেও পাস হয় মাত্র ১টি। আর বিগত নবম সংসদে সবচেয়ে বেশি বিল পাস হয়েছে। সেই সংসদে ২১ টি বিল আনা হলেও পাস হয় ৩টি। এছাড়া দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের ৪৭টি বিলের মধ্যে পাস হয় ২টি। ৩য় জাতীয় সংসদে ৫টি বিলের মধ্যে পাস হয় ১টি। ৪র্থ জাতীয় সংসদে ৬টি আনা হলেও একটিও পাস হয়নি। ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদে বেসরকারি কোনো বিলই পাওয়া যায়নি। ৭ম জাতীয় সংসদে ৫১টি বিল আনা হলেও পাস হয় ১টি। ৮ম সংসদে ৫৪টি বিলের মধ্যে ১টি পাস হয়।  ৯ম সংসদে ২১টি বিলের মধ্যে পাস হয় ৩টি আর  চলতি দশম সংসদ ১৫টি বিল আনা হলেও একটিও আলোর মুখ দেখেনি। তবে স্বতন্ত্র সদস্য মোঃ রুস্তম আলী ফরাজীর (পিরোজপুর-৩) আনা সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) বিল, ২০১৭ এর আইডিয়া নিয়ে আরেকটি নতুন বিল আনে সরকার । গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক প্রার্থী সর্বোচ্চ তিন আসন থেকে নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী ততোধিক আসনে নির্বাচন করতে পারবেন। এই বৈপরিত্য দূর করার জন্য পিরোজপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মোঃ রুস্তম আলী ফরাজী বিগত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) বিল, ২০১৭ (সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদ সংশোধন) নামে একটি বিল এনেছিলেন। কিন্তু আজও তা পাস হয়নি। তবে গত মাসে বিলটি সংসদে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সংসদীয় কমিটি। এই বিলগুলো পাস হওয়া উচিত কিনা এই প্রশ্নের জবাবে রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, অনেক বিল আছে যা পাস করলে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে কোনো ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। এগুলো পাস করতে পারে। এসব পাস করলে সংসদ অর্থবহ, প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসু হবে। এই পার্লামেন্টকে মানুষ মূল্যায়ন করবে।   
সংসদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার হাজিরার রেকর্ড
বিদায়ী সংসদের ২৩তম অধিবেশন পর্যন্ত এর কার্যদিবস ছিল ৪১০ টি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা হাজির ছিলেন ৩৩৮ কার্যদিবস । আর বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ হাজির ছিলেন ২৪১ দিন। বিগত নবম সংসদের কার্যদিবস ছিল ৪১৮ দিন। সেই সংসদে ১৯টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ৩৩৬ দিন। আর বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা ছিলেন মাত্র ১০ দিন।
সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণ
২০১৪ সালের ৩ জুলাই (দ্বিতীয় অধিবেশন) জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ (ঢাকা-৬) একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনেন। পরে তা পাসও হয়। তার সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি ছিল- ‘যুদ্ধকালীন আদর্শিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বিএলএফ-এর ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সদস্যদের তালিকাটি জরুরী ভিত্তিতে আনা হউক।’ কিন্তু আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি (৫ম অধিবেশন) আওয়ামী লীগ মোঃ মনিরুল ইসলাম (যশোর-২) আরেকটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব  আনেন। তার প্রস্তাবটি ছিল, ‘অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনাদের একটি তালিকা করিয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হউক।’  তবে এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের পর এ নিয়ে কাজ শুরু করলেও এখনও শেষ করতে পারেনি।
২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর (১২তম অধিবেশন) আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি আরেকটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনেন। ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের এবং যুদ্ধ অপরাধীদের ও সকল মানবতা বিরোধী অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধী ব্যক্তিদের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হউক-’ এ সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করার জন্য আইন করার দরকার হলেও এখনও সেই উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২০১৭ সালের ৪ মে (১৫তম অধিবেশন) আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি আরেকটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনেন । গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য আইন প্রণয়ন করা হউক”- সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি পাস হলেও এখনও আইন করা হয়নি। সংসদের কার্যাপ্রণালী বিধি ১৪৩ এর (২) ধারা অনুযায়ী গ্রহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পরে মন্ত্রী সংসদে তা জানাবেন। কিন্তু অনেক দিন আগে এই চারটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাস হলেও এ সম্পর্কে মন্ত্রীরা কে কি করেছেন তা সংসদে জানাননি তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, সবগুলোর যে কাজ হয়নি তা নয়, কিছু কিছু কাজ চলছে। সবগুলো বাস্তবায়ন হলেই সংসদকে অবহিত করা হবে।
সংবিধান সংশোধন দুইবার
২০১৪ সালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনরায় ফিরিয়ে দেয়া হয়, যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানেও ছিল।  সংশোধনীর এতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা বিচার বিভাগ গঠিত সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাত থেকে সংসদের কাছে ন্যস্ত করা হয়। যদিও হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্ট সংবিধানের এই সংশোধনকে অবৈধ হিসেবে রায় দিয়েছে। ষোড়শ সংশোধন নিয়ে হওয়া মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পরই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেন। নারী আসনের বিধান আরও ২৫ বছর করে সংবিধান সংশোধন ২০১৮ সালে। ‘সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) বিল-২০১৮’নামে বিলটি পাস হয উত্তাপহীনভাবে। এই বিলের কেউ বিরোধীতা করেনি।  এর আগে পর্যায়ক্রমে সংবিধানের ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদ আরো চারবার সংশোধনীর মাধ্যমে নারী আসনের মেয়াদ ও সংখ্যা বাড়ানো হয়। চলতি সংসদের মেয়াদান্তে এই বিধান অব্যাহত রাখতে এই সংশোধনী বিল পাস করা হয়। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান নারী আসনের মেয়াদ শেষ হত। কিন্তু সপ্তদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় পরবর্তী সংসদ থেকে তাদের মেয়াদ আরো ২৫ বছর হবে।
১৫টি ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনা সংসদের নোটিশ শাখা সূত্র জানায়, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ ধারা অনুযায়ী দশম ৩০টি ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অন্যগুলোর কোনটি বাতিল, কোনটি তামাদি আর অন্যগুলো ১৫১ বিধি অনুসারে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বিধিতে মুলত কোনো অর্জন নিয়ে সংসদে আলোচনা করা হয়। এরপর তা ভোটে দিয়ে ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস করা হয়।
দশম সংসদে এ ধরনের আলোচনার ৮টিই প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বিভিন্ন আন্তজার্তিক পুরস্কার ও নেতৃত্বগুন নিয়ে। এছাড়া অন্যগুলো হল গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন; স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সি পি এ-এর নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন এবং সাবের হোসেন চৌধুরী আইপিইউ-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায়, ‘বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তিনজন নারী ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স-এর সদস্য নির্বাচিত হওয়ায়, গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে,  ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় এবং পবিত্র নগরী মদিনায় ও ফ্রান্সের নিস শহরে সন্ত্রাসী জঙ্গি হামলা নিয়ে ,২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা নিয়ে, সংবিধান ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধান ষোড়শ সংশোধনী টষঃৎধ ঠরৎবং ঘোষণাকে বাতিল করার জন্য ও প্রধান বিচারপতি কর্তৃক জাতীয় সংসদ সম্পর্কে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে অসাংবিধানিক, আপত্তিকর ও অপ্রাসংগিক পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে তা বাতিল করার জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিয়ে।  এছাড়াও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, তাদেরকে তাদের নিজ বাসভূম থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশইন করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের উপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো নিয়ে এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনোস্কো  কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য (ডড়ৎষফ উড়পঁসবহঃধৎু ঐবৎরঃধমব) হিসেবে টঘঊঝঈঙ এর গবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জবমরংঃবৎ এ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশ ও জাতির সাথে আমরা গর্বিত এবং এজন্য টঘঊঝঈঙ  সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জাতীয় সংসদ ধন্যবাদ জানানো নিয়ে।
সিপিএ ও আইপিইউ এর প্রতিনিধি এই সংসদে
দশম সংসদ আরও দু’টি ঘটনার জন্য ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। এই সংসদের দু’জন সদস্য আন্তর্জাতিক দু’টি ফোরামের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। এই দুটি সংগঠনের সম্মেলনেও ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
দশম জাতীয় সংসদ নিয়ে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, আমার দৃষ্টিতে দশম সংসদ একটি ফলপ্রসূ সংসদ। আমি ১৯৮৬ সালের পর থেকে সংসদে আছি, ওই সময়ের পর এবারের সংসদই সবচেয়ে প্রাণবন্ত কার্যক্রম চলেছে। তিনি বলেন, ২০০১ সালে সংসদে বিরোধীদলকে প্রায় কথা বলতেই দেয়া হয়নি। প্রায় দুইশ আইন প্রণয়নসহ সার্বিক কার্যক্রম বিবেচনায় দশম সংসদ অত্যন্ত সফল।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd