ঢাকা : বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে : কাদের          ঈদে হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ          নবম ওয়েজ বোর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা           বন্দরসমূহের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ ১৩:০৮:৫৩আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫১:১৭
মণিপুরীদের মহারাসলীলা আজ
পিন্টু দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)


 


দুটি পাতা একটি কুঁড়ি প্রকৃতির অপার লীলাভূমি সমৃদ্ধময় মনিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের মহারাসলীলা ২৩ নভেম্বর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এলাকা জুড়ে বিরাজ করছে উৎসব আমেজ। আনন্দের বাহারে মানুষের তনু মন উল্লসিত।
মহারাস বলতে প্রেমরসকে বুঝানো হয়েছে। বস্তুত রস শব্দ থেকেই রাস শব্দটির উৎপত্তি। রস আস্বাদনের জন্য রাধাকৃষ্ণের লীলানুকরণে নৃত্য গীতের মাধ্যমে যে উৎসব উদযাপন করা হয় তাই রাসোৎসব। নৃত্য, সংগীতে  মনিপুরীদের প্রাচীন জাতীয় লোক নৃত্য ‘লাই হারাওবা থেকেই রাস নৃত্যের সৃষ্টি।
প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে স্বাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণময় শিল্পকলা সমৃদ্ধ মনিপুরী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী মহারাসলীলা উৎসব। মনিপুরী অধ্যূষিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরের আশ্বিন মাসের শুরু থেকেই উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। উপজেলার মনিপুরী সম্প্রদায়ের লোকের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেতে উঠে এ আনন্দ উৎসবের। দেশের বিভিন্ন স্থান সহ  ভারত থেকেও মনিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজন সহ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে অনেকেই ছুটে আসেন মহারাসলীলা অনুষ্ঠান উপভোগের জন্যে। মনিপুরী সম্প্রদায় অধ্যুষিত কমলগঞ্জের মাধবপুর ও আদমপুরের রাসোৎসবের জন্যে তৈরী ম-পগুলো সাদা কাগজের নকশায় সজ্জিত ম-পগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে আগত শিশু নৃত্য শিল্পীদের সুনিপুণ অভিনয় যেন মন্ত্র মুগ্ধ করে রাখে দর্শনার্থীদের।
রাসলীলা উপলক্ষে মাধবপুর শিববাজারস্থ জোড়ামণ্ডপে শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে গোধুলীলগ্ন পর্যন্ত রাখালনৃত্য, সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাত ৯টায় নট সংকীর্ত্তন, রাত্র ১১টা থেকে ঊষালগ্ন শ্রীশ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ড. মো: আব্দুস শহীদ এমপি।
অন্যদিকে আদমপুরস্থ তেতইগাঁও মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্সে ৩৩তম মহারাসলীলা উৎসব দিবারাত্রি সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হবে। এ আয়াজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ড. মো: আব্দুস শহীদ এমপি।
জানা যায়, ১৭৭৯ খৃস্টাব্দে মণিপুরের মহারাজ স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে যে নৃত্য গীতের প্রবর্তন করেছিলেন তা-ই রাসনৃত্য। মহারাজার মৃত্যুর একশত বছর পরে মহারাজ চন্দ্র কীর্তির শাসনামলে গোটা রাস নৃত্য আচৌকা ভঙ্গী, বৃন্দাবন ভঙ্গী, খুডুম্বা ভঙ্গী, গোষ্ট ভঙ্গী, গোষ্ট বৃন্দাবন ভঙ্গী, আচৌবা, বৃন্দাবন ভঙ্গী তা-ব পর্যায়ে পড়ে। উলে¬খ্য, মহারাজ ভাগ্য চন্দ্রের পরবর্তী রাজাগনের বেশিরভাগই ছিলেন নৃত্য গীতে পারদর্শী এবং তারা নিজেরাও রাস নৃত্যে অংশগ্রহণ করতেন। এর ফলে মনিপুরীরা এ কৃষ্টির ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই ১৯৪২ খৃস্টাব্দ থেকে আজও কোনও রূপ-বিকৃতি ছাড়াই কমলগঞ্জে উদযাপিত হয়ে আসছে এ রাস উৎসব। মনিপুরী এ নৃত্যকলা শুধু কমলগঞ্জের নয় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্য কলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে।
১৯২৬ সালের সিলেটের মাছিমপুরে মনিপুরী মেয়েদের পরিবেষ্টিত রাস নৃত্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরে কবিগুরু কমলগঞ্জের নৃত্য শিক্ষক নীলেশ্বর মুখার্জীকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে প্রবর্তন করেছিলেন মনিপুরী নৃত্য শিক্ষা।
রাসোৎসবের কয়েকদিন পূর্ব থেকে চলেছে এর প্রস্তুতি। মনিপুরী সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি কুমারী ও কিশোরদের রাস লীলায় অংশগ্রহণ করার জন্যে নৃত্য ও সংগীতের তালিম নেয়ার ধুম পড়ে। কিশোরীরা  রাসলীলায় অংশগ্রহণ করে এবং রাখাল নৃত্যের শিশু-কিশোর অংশগ্রহণ করে। রাখাল নৃত্য সাধারণ দিনের বেলায় অর্থাৎ সূর্যাস্তের আগেই অনুষ্ঠিত হয়। কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথি ২৩ নভেম্বর শুক্রবার দুপুরে শিশু শিল্পীরা রাখাল সাজে সজ্জিত হয়ে একটি মাঠে সমবেত হবে। এদের পরনে থাকবে ধূতি, মাথায় ময়ূর, পালকের মুকুট, কপালে চন্দ্রের তিলক, গলায় সোনার মালা, হাতে বাঁশি ও পায়ে নূপুর। এরপর বাঁশি হাতে বাদ্যের তালে তালে নৃত্য করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন অনূকরণে একজন শিশু শিল্পী মাঠে প্রবেশ করবে। অনেকক্ষণ ধরে চলবে এই নৃত্য গীতি। রাতে শুরু হবে মহারাস লীলা। শুরুতেই পরিবেশিত হয়  রাসধারীদের অপূর্ব মৃদঙ্গ নৃত্য। মৃদঙ্গ নৃত্য শেষে প্রদীপ হাতে নৃত্যের তালে তালে সাজানো মঞ্চে প্রবেশ করেন শ্রীরাধা সাজে সজ্জিত একজন নৃত্যশিল্পী তার নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যের তালে তালে পরিবেশিত হবে মনিপুরী বন্দনা সঙ্গীত। শ্রীকৃষ্ণ রূপধারী বাঁশী হাতে মাথায় কারুকার্য খচিত ময়ুর পুচ্ছধারী এক কিশোর নৃত্য শিল্পী তার বাঁশির সুর শুনে  ব্রজ গোপী পরিবেষ্টিত হয়ে কুমারী শ্রী রাধা মঞ্চে আসবে। শুরু হবে সুবর্ণ কংকন পরিহিতা মনিপুরী কিশোরীদের  নৃত্য প্রদর্শন।
এ রাসোৎসব ঘিরে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মন্ডপ এলাকায়  প্রতি বছরই বসে মেলা। কৃষি সরঞ্জাম, মাটির তৈরী সামগ্রী, ঘর কন্যার সামগ্রীসহ নানা দ্রব্যের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। এছাড়া মণিপুরীদের নিপুন হস্তে তৈরী তাঁতের বিভিন্ন রকমের কাপড়। সারারাত ধরে চলে মেলা। মেলায় মনিপুরীদের তৈরী সামগ্রীর দোকানগুলোতে থাকে  ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।
মহারাত্রির আনন্দের পরশ পেতে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর,কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দেশী-বিদেশী পর্যটক, বরেণ্য জ্ঞাণী-গুণী লোকজনসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠবে গোটা উৎসব অঙ্গন। মণিপুরী সম্প্রদায়ের পূণ্যস্থাণ হিসাবে বিবেচিত মাধবপুর ও আদমপুরে রাসোৎসবের জন্য তৈরী সাদাকাগজের নকশায় সজ্জিত মন্ডপগুলো এই একটি রাত্রির জন্য হয়ে উঠবে লাখো মানুষের মিলনতীর্থ। মনিপুরী শিশু নৃত্যশিল্পীদের সুনিপুন নৃত্যাভিনয় রাতভর মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের।  
রাস উৎসবে আসার রাস্তা  
সড়ক কিংবা রেলপথে দেশের যেকোন স্থান থেকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে আসা যায়। কমলগঞ্জ উপজেলা সদরের ভানুগাছ বাজার চৌমুহনী থেকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সড়ক হয়ে প্রায় ৪ কিঃ মিঃ দূরে মাধবপুর জোড়া মন্ডপস্থ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের রাসলীলা অনুষ্ঠান স্থলে যাওয়া যায়। অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলা সদরের ভানুগাছ বাজার চৌমুহনী অথবা উপজেলা চৌমুহনী থেকে যেকোন যানবাহনে আদমপুর সড়ক দিয়ে প্রায় ৮ কিঃ মিঃ এগিয়ে গেলেই আদমপুর বাজার। আদমপুর বাজারের পাশেই মণিপুরী মৈ-তৈ সম্প্রদায়ের মহারাসলীলার অনুষ্ঠানে যাওয়া যায়।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

Developed by orangebd