ঢাকা : শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে          বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের আরসিবিসির মামলা          দুর্নীতি করলেই যথাযথ ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রী          মিয়ানমার সংকট : শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় জাতিসংঘ
printer
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৩:০২:১৭
কোমর ব্যথার যন্ত্রণা, আর না
প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার


 


প্রতিটি মানুষ সুস্থ্যভাবে বাঁচতে চায়। কারন মানুষ পৃথিবীতে আসে অল্প সময়ের জন্য, আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই করে যেতে হয় অনেক কিছুই। আমাদের ব্যস্ত জীবনের বুননের মাঝে অবিচ্ছেদ্য এক অংশই দাঁড়িয়েছে কোন না কোন শারীরিক সমস্যা। বর্তমান সময়ে খুব বেশি পরিচিত এবং কষ্টে ফেলে দেয়ার মত একটি সমস্যা কোমরের ব্যথা জনিত অসুস্থ্যতা।  
ব্যথা নেই বা জীবনে একবার কোমর ব্যথা হয় নাই এমন লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন গবেষনায় ফিজিওথেরাপি বিজ্ঞানী, ব্যাকপেইন ইনস্টিটিউট, মাস্কুলোস্কেলিটাল ডিজঅর্ডারস বিশেষজ্ঞ ও পেইন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি এ্যাসোসিয়েশন এর মতে, সারাবিশ্বের ৮০ ভাগ প্রাপ্ত বয়স্ক লোক জীবনের কোন না কোন সময় কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন। এমন কোন পরিবার নেই, যে পরিবারের কোন না কোন সদস্যের কোমর বা মাজা ব্যথা নেই। কোমর ব্যথা ও শিরদাঁড়া অতপ্রোতভাবে জড়িত। শিরদাঁড়া আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্ব পূর্ণ। শিরদাঁড়া ছাড়া আমরা দাড়াতে পারবোনা। শিরদাঁরার মধ্যে গুরুত্বপূর্ন স্পাইনাল কর্ড থাকে। শিরদাঁড়া আমাদের শরীরের ওজন বহন করে এবং কাজ কর্ম করতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন গবেষক বলেছেন- ১০০% রুগী, যারা মাজা বা কোমর ব্যথায় ভোগেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো- মেকানিকাল ৭০%, ডিজেনারেশন ১০%, ডিস্ক এর অসুবিধার জন্য ৪%, অষ্টিওপোরেসিস ৪%, স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিস ৩%, স্পন্ডিলোলিসথেসিস ২% এবং অন্যান্য কারণ ৭%। এছাড়াও সমাজের প্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের মধ্যে ১০% ভাগ ক্রনিক পেইন এ ভোগেন। এই ১০% এর মধ্যে কোমর ব্যথার রুগীও রয়েছে। কর্মসংস্থান রিপোর্টে দেখা গেছে অফিস এক্সিকিউটিভদের মধ্যে ১২% কর্মকর্তা কোমর ব্যথায় ভোগেন।  ২% লোক ইনফ্লামেটরী কারণের জন্য এবং ভিসারাল অসুবিধার জন্য ১% লোক কোমর ব্যথায় ভোগে থাকেন।
আমাদের দৈনিন্দন জীবন চলার পথে বিভিন্ন ভঙ্গীতে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে সারাদিনের মধ্যে আমরা বসে, সামনে ঝুঁকে বেশি সময় কাজ করে থাকি। শিরদাঁড়ার গঠন অনুযায়ী প্রথমে মাস্লই বেশী ইনজুরী হয়। আমার দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণায় দেখেছি, ব্যাকপেইন হওয়ার প্রধান কারন বেশী সময় বসে বসে কাজ করা, বসে এবং সামনে ঝুকে কাজ করা ও বসে-সামনে ঝুকে ডান বা বাম দিক থেকে কোন কিছু নেওয়া কিংবা হঠাৎ করে নীচু হয়ে ভারী জিনিস উঠানো। আমি মনে করি, যদি আমরা সামনে ঝুঁকে কাজ না করতাম এবং বসে কাজ না করতাম তাহলে আমাদের কোমর ব্যথাই হতো না। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য তা সম্ভব নয়। এছাড়াও  ডিক্স এর অসুস্থ্যতা, শিড়দাঁড়ায় টিউমার, ইনফেকশন এবং হাড়ভাংগার জন্যও মাজা বা কোমরে ব্যথা হতে পারে। তবে এই কারন সমুহের জন্য যে ব্যথা হয়- সে রকম রুগীর সংখ্যা খুবই কম। কোমর ব্যথা সাধারনত- শুধু কোমরে থাকে, আবার কখনো কখনো ব্যথা কোমর থেকে পায়ের দিকে যায়। কোন কোন রুগীর বসে থাকলে বেশী ব্যথা হয়, আবার কখনো কখনো হাটলে বেশী হয় এবং কখনো কখনো হাঁটলে কমেও যায়। অবশ্য এই উপসর্গগুলো নির্ভর করে কোমর ব্যথা কি কারণে হয়েছে। যেমন- বিশেষ করে লক্ষণীয় যে, ব্যথা কি ডিস্ক জনিত কিংবা পাইরিফরমিস সিনড্রম-এর জন্য। কোমর ব্যথার চিকিৎসা দুই ভাবে করা যেতে পারে। তবে কোমর ব্যথার অন্যতম চিকিৎসা ফিজিওথেরাপি বা নন-সারজিক্যাল সলিউশন। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা  শুরুর পূর্বেই রুগীর পূর্ণ শারীরিক এ্যাসেসমেন্ট এবং ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করা দরকার। কারন পরিপূর্ণ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা একমাত্র সঠিক এ্যাসেসমেন্ট এবং অন্যান্য পরীক্ষার উপরই অধিকাংশ সময় নির্ভর করে। পঙ্খানুপঙ্খানু শারীরিক পরীক্ষাই বের করে দেয় রোগীর কি কি অসুবিধা আছে বা কোন মাস্ল, লিগামেন্ট, ডিক্স বা কোন কোন স্ট্রাকচারে অসুবিধা। আমার ৪০ বৎসরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সঠিক অসুস্থ স্ট্রাকচার নির্নয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করা সম্ভব। যেমন- এ্যাকটিভ এবং প্যাসিভ মুভমেন্ট বলে দেয় রোগীর কোন স্ট্রাকচার-এ অসুবিধা। অর্থ্যাৎ রোগীর কন্ট্রাকটাইল বা নন কন্ট্রাকটাইল-এর কোন স্টাকচার অসুস্থ তা সহজেই বের করা যেতে পারে।
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অবশ্যই এ্যাভিডেন্স বেস্ড বা প্রমান সাপেক্ষ্যে করতে হবে। যেমন- কি কারণে রোগীর কোমর ব্যথা হচ্ছে। ঐ কারণকে সঠিক ও উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথার কষ্ট দূর করা সম্ভব। কারণ ব্যথার কষ্ট দূর হলেই রোগী ভাল হয়ে যায়। চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীর সমস্যাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- অল্পদিনের অসুস্থতা এবং বেশী দিনের অসুস্থতা। আর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার স্বার্থে সম্পুর্ণ শিরদাঁড়াকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়।  অল্পদিনের অসুস্থতা বা কষ্টের জন্যে অল্প বিশ্রাম, প্রাথমিকভাবে ব্যথা নাশক ঔষধ, মাংসপেশী শিথিল করার জন্য মাস্ল রিলাকজেন্ট এবং এর সঙ্গে ভিটামিন, সিডেটিভ ও ক্যালসিয়াম জাতীয় ঔষধ খাওয়া যেতে পারে। বিশ্রাম এবং ঔষুধের সাথে সাথে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাবশ্যক। অনেকেই বলে থাকেন ব্যথা থাকা অবস্থায় ব্যায়াম করবেন না। কিন্তুু আমি বলবো, সঠিক ব্যায়াম বা এক্সারসাইজ ব্যথানাশক হিসাবে কাজ করে। শুধু সঠিক ব্যায়ামই খুব দ্রুত কমর ব্যথা কমাতে তাৎক্ষনিক সাহায্য করে এবং তা প্রমাণিত।
এখানে একজন কোমর ব্যথার রুগীর কথা উল্লেখ করছি। রুগীর বয়স ৬২ বৎসর। গত ১ বছর যাবৎ কোমরের বাম পাশে ব্যথায় ভুগছেন। হাঁটলে ব্যথা বাম কোমর থেকে পা পর্যন্ত যায় ও শির শির করে। বসলে ভালো লাগে। তার ফিজিক্যাল পরিক্ষায় পেলাম- দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বাম কাফ মাসলে যায়, দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকলে কোমরে ব্যথা পায়। দাঁড়িয়ে পিছনে ঝুকলে কোন ব্যথা পায় না। উপুর হয়ে শুইয়ে মাথা ও কাঁধ উঠালে ব্যথা বাম থাই মাসলে যায় এবং ইরেক্ট্রো স্পাইনি মাসল দূর্বল। এছাড়াও তার ডর্সাল কাইফোসিস, রাউন্ডেড সোল্ডার এবং ফরোয়ার্ড হেড পোশ্চার আছে। এমআরআইতে পাওয়া গেছে- এল২-৩ বাম দিকে স্টেনোসিস এবং এল৩-৪ ডান দিকে স্টেনোসিস, এল৩-৪ ডিস্ক ইক্সট্রুশন, এল৪-৫ পট্রিউশন। এক্স-রে তে দেখা গেছে- এল২-৩ রিট্রোলিসথিসিস সরে গেছে এবং লেফ্ট ইলিয়াম ডান দিকের চেয়ে উঁচু হয়ে আছে।
পরামর্শ : বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু ধরে বুকের দিকে বার বার টানুন। টেনে ধরে রাখেন ৫ সেকেন্ড থেকে ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত। এভাবে ১৫-২০ বার টানবেন দিনে দুই বার। ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত নারিকেল তেল লাগান, তার উপরে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ডিপফ্রিকশন এবং মায়োফেশিয়াল রিলিজ করতে হবে। এরপর স্ট্রেসিং এবং স্ট্রেন্দ্রেনিং এক্সারসাইজ করতে হবে বিভিন্ন মাসলের। সুন্দর করে স্ট্রেসিং করতে হবে সায়োটিক নার্ভের। এছাড়াও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বিভিন্ন মোডালিটিস ব্যবহার করতে হবে।
খাদ্য তালিকায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে যেমন- প্রচুর পানি বা জুস, চেরী ফল, দিনে ২ গ্লাস দুধ (খাবরের ১ ঘন্টা পূর্বে অথবা খাবারের ২ ঘন্টা পরে) খাবেন। তিল ভর্তা, পূর্ণ সিদ্ধ ডিম, আদার রস ও রসুন নিয়মিত খাবেন। ৮ ঘন্টা একটানা ঘুমাবেন। এ ধরনের ব্যথার জন্য সূর্য্যতাপ অনেক উপকারী।  সেজন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩ টার মধ্যে খালি গায়ে সূর্য্যরে তাপ লাগাতে হবে। ভিটামিন ডি জাতীয় খাবার বেশী খেতে হবে।
কোমর ব্যথার চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা অবশ্যই ভাল। সেজন্য সামনে ঝুঁকে এবং সামনে ঝুঁকে ও ডানে-বামে বাঁকা হয়ে কাজ করার সময় বেশি সতর্ক থাকবেন এবং পেটের মাংস শক্ত করে কাজ করবেন। দৈনিন্দন জীবনে কাজ-কর্ম এবং চলাফেরায় সঠিক ভঙ্গি মেনে চলবেন। একই অবস্থায় বেশিক্ষন কাজ করবেন না। প্রতিদিন ঘুমাতে যেতে এবং ঘুম থেকে উঠার পরে বালিশ ছাড়া উপুর হয়ে শুয়ে থাকবেন এবং মাথা ও কাঁধ উঠিয়ে নিয়মিত এক্সারসাইজ করবেন। ধুমপান বর্জন করবেন।
ফিজিওথেরাপি বিজ্ঞানী এবং নন সার্জিকেল সলিউশন ফর দ্যা স্পাইন-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও এমন ওষুধ তৈরি হয় নাই যে ওষুধ খেলে আপনার দীর্ঘ দিনের ব্যথা কমে যাবে, আপনার মাংস পেশী লম্বা হবে, শক্তিশালী হবে এবং আপনার জয়েন্ট মবিলিটি বেড়ে যাবে। তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ইজ এ মেডিসিন যা আপনাকে উক্ত কষ্টগুলো থেকে মুক্তি দেবে।
ব্যাকপেইন বিশেষজ্ঞ
লেজার ফিজিওথেরাপি সেন্টার
পান্থপথ, ঢাকা।    
০১৭৬৫ ৬৬ ৮৮ ৪৬, ০১৭৮৫ ৯৯ ৯৯ ৭৭

printer
সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্য ও জীবন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd