ঢাকা : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:০৭:২৭
মুসলিম খান : আজীবন সংগ্রামী সাহসী মানুষের প্রতিকৃতি
বজলুর রায়হান


 


‘তোমার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় না বন্ধু। নারায়ণগঞ্জ এলে দেখা করে যেও। তুমি আসতে না পারায় আমিই ওদের সঙ্গে জামালপুর চলে এলাম। তুমি নারায়ণগঞ্জে এসো, দেখা হলে খুশি হবো।’
৪ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় বন্ধু মুসলিম খান দুলারার সঙ্গে এমনটাই ছিল আমার কথোপকথন। প্রিয় কবিবন্ধু অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহই ওইদিন ওর ফোন থেকে কল দিয়ে অনুযোগ করলো- কী, তুমি আসতে পারলে না? এতোই ব্যস্ত!
এরপর একে একে কথা বললেন অগ্রজ ছড়াকার-সাংবাদিক ইউসুফ আলী এটম এবং নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক সময়ের আপসহীন উজ্জ্বল মুখ মলয় দাস চন্দন। কথা বললেন না শুধু একজন; তিনি কবি-শিক্ষাবিদ-কলামিস্ট করীম রেজা। জামালপুর বেড়াতে যাবার জন্য ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে দু’জন শুধু প্ল্যানই করছিলাম। দু’বছরেও বেড়াতে যাবার মতো তিন-চারটা দিন আমার হয়ে উঠছিল না। খুব লজ্জিত হলাম। জানি কবিবন্ধু অভিমানী, কিন্তু সেটি যে এতো প্রগাঢ়- এতোটা গভীর তা অফিসে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে অনুভব করেছি। তিলে তিলে। বন্ধু করীম রেজার যে অভিমান তা সঙ্গত কারণেই। যাবো যাবো করে দিনক্ষণও ঠিক করেছিলেন এটম ভাই, চন্দনদা আর করীম। অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহ এখন জামালপুরে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তারও ব্যস্ততা কম নয়। এর মাঝেই দিনক্ষণ ঠিক হলো ৪ অক্টোবর সকালে ট্রেনে জামালপুরে যেতে হবে। ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত আমারই যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেল। অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেও ছুটি সমন্বয় করতে ব্যর্থ হলাম। খুব কষ্ট পাচ্ছি। যন্ত্রণা বোধ করছি। এ কষ্টের কথা কারো সঙ্গে শেয়ারও করতে পারছি না। শুধু মনে হলো- সহকর্মী কেউ কেউ শুধু নিজেরটা নিয়েই ভাবতে পারেন, কারো কাজের অতিরিক্ত ভার একদিনের বেশি নিতে চান না।
বলছিলাম মুসলিম খান দুলারার সঙ্গে আমার বাক্যালাপ। দুলারা ওর ডাক নাম- আমি মুসলিম নামেই বরাবর ডেকে এসেছি পরিচয়ের দিন থেকেই। ৪ অক্টোবর বিকেলে ওর সেই বাক্য বিনিময়ই যে অল্প দিনের ব্যবধানে স্মৃতি হয়ে থাকবে ওইদিন তা কী বুঝতে পেরেছিলাম! জামালপুরে আমার পরিবর্তে মুসলিম খানের বেড়াতে যাওয়া যে ওর লাস্ট ট্রেন জার্নি হবে তা কেন যেন বিশ্বাস করতে পারি না। সদা হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মুসলিম খান এতো অকালে না ফেরার দেশে চলে যাবে ভাবতেও পারি না। এক সময়ের দুরন্ত সাহসী, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু যোদ্ধা, রাজপথে সেøাগান দিয়ে মিছিল মাতিয়ে রাখা অকুতোভয় মুসলিম খান অকালেই চলে যাবে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ভাবতেও কষ্ট হয়। সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের জন্য মুসলিম খানের নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেকেরই জানা। আমার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে মুসলিম ছিল অত্যন্ত নির্ভীক। নিঃশঙ্ক চিত্তে অনেক কাজ করেছে সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে।
বন্ধু সবাই হয় না। সবাই হতে পারে না। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অনেক বড়। মুসলিম খান দুলারা আমার বন্ধু। কলেজ জীবনে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা সহযাত্রী। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৫ সালে নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হবার পর। মুসলিম খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আরেক বন্ধু এ বি এম সেলিম (বর্তমানে জাপান প্রবাসী)। পিতার কর্মসুবাদে বগুড়ার সান্তাহার থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চুয়াত্তরের নভেম্বরে পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে আমারও নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে ফিরে আসা। আশা ছিল এসএসসির ফল ভালো হলে ঢাকা কলেজে পড়বো। আমার বড় মামা ঢাকা কলেজে পড়েছেন। এ কলেজ দেশের অন্যতম সেরা। আশানুরূপ ফল না হওয়ায় তোলারাম কলেজেই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। ক্লাস শুরুর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে পেলাম বাকী বিল্লাহকে। ওইদিন বাকী বিল্লাহ লুঙ্গি পরে কলেজে এসেছিল। হয়তো অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ অথবা কৌতূহলের জন্য কিংবা ছিল হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াস। ক্লাস টিচার (সম্ভবত বায়োলজির হাবিবুর রহমান স্যার) বাকী বিল্লাহকে লুঙ্গি পরে ক্লাসে আসার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। সেই দিনই কিছুটা যেচে ওর সঙ্গে পরিচিত হলাম। বাকী বিল্লাহ ভালো গান গাইতো। ওর বড় ভাই গোলাম মোস্তফাও একজন ভালো কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। তাঁরই অনুজ বাকীর কন্ঠে থাকতো ওই সময়ের জনপ্রিয় অনেক গান- যা রেডিওতে শুনে মুখস্থ করা। ভালো কবিতাও লিখতো। ক্লাসে বসে স্যারের নোট নেওয়ার বদলে কবিতা লিখতে শুরু করতো। এসব দেখে আমি বাকী বিল্লাহর প্রেমেই যেন পড়লাম। ছুটির পর বিকেলে আড্ডা দেওয়া আমাদের রুটিন হয়ে গিয়েছিল। বাকী ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে স্কুলে থাকতেই জড়িত ছিল। কলেজে তখন ছাত্র সংসদের ভিপি রোকনউদ্দিন আহমেদ (এখন আওয়ামী লীগ নেতা) এবং জিএস আনোয়ার হোসেন (বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান)। আনোয়ার ভাই কলেজে ছাত্রলীগের নতুন সদস্য তালিকা করছেন। আমাকেও বললেন ছাত্রলীগে যোগ দিতে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হলো বাকী বিল্লাহকে, আমাকে করা হলো সহ-সাধারণ সম্পাদক। আমাদের পড়ালেখার পাশাপাশি আনোয়ার ভাই সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতে বললেন।
ওই বছর কলেজে নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ উদযাপন করা হলো বেশ আড়ম্বরে। এ সময়েই মুসলিম খানের অক্লান্ত পরিশ্রম করার বিষয়টি খুব কাছ থেকে দেখেছি। বড় আয়োজনে অনেক কর্মী প্রয়োজন হয়। ইতিমধ্যে দেশে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন মিলে গড়ে তোলা হয়েছে জাতীয় ছাত্রলীগ। মুসলিম খান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। একটা সময়ে আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। শহরের খানপুর এলাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান মুসলিম খান দুলারা। চোখে-মুখে বড় হবার প্রত্যয় ভেসে থাকতো সবসময়। আড্ডা মাতিয়ে রাখতে মজার মজার অনেক কথা বলতো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সপরিবারে হত্যা করা হলো। দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহর থমথমে। রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাই আত্মগোপনে। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। শহরে সেনা ও পুলিশ টহল চলছে। এর মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নের সাহসী ক’জন কর্মী নারায়ণগঞ্জ শহরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ১৬ আগস্ট সকালে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। প্রতিবাদী ওই মিছিলে কাজী জহিরউদ্দিন কাবলু, কবি হালিম আজাদ, মুসলিম খানসহ আরো ক’জন অংশ নিয়েছিলেন।
মুসলিম খান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে এসেও রাজনীতির সঙ্গ ছাড়েনি। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও সে ছিল অনেক তৎপর। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে মুসলিম। বিপুল প্রাণশক্তির অধিকারী ছিল। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারার আন্দোলন-সংগ্রামে আপসহীন ভূমিকা পালনে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক অবদান রেখেছে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মুসলিম খান নারায়ণগঞ্জে সাহসী ভূমিকা পালন করে। অন্যায় অসত্য অবিচারের বিরুদ্ধে বরাবর লড়াকু মনোভাব নিয়ে কাজ করেছে। সমসাময়িক যারা ওই আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলাম তারা দেখেছি অদম্য মনোবল নিয়ে মুসলিম খান কতটা দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেছে।
মুসলিম খান দুলারা আমার বন্ধু। ভাবতে ভালো লাগে এমন একজন বন্ধু আমার সে- যার চেতনা ছিল শাণিত ও দীপ্র। নেতৃত্বের সকল গুণ থাকা সত্ত্বেও সতীর্থ মুসলিম খান একজন সাধারণ কর্মীর মতোই সংগঠনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত উদার। এমন একজন রাজনীতির যোদ্ধা হয়ে সে দেখতে চেয়েছে শোষণহীন সমাজ, সাম্যবাদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনে কোনো ঘাটতি ছিল না ওর। সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করেছে আজীবন। মুসলিম খান সমাজে পরিচিতি গড়েছিল একজন মানবদরদি হয়ে। দলের নেতাদের আস্থাভাজন হিসেবে অর্জন করেছে বিশেষ মর্যাদা। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিশ্চল থাকেনি- কী রাজপথের মিছিলে, কী সভা-সমাবেশে। সব কিছুতেই প্রাঞ্জল উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। ১৯৮৮-র বন্যায় নারায়ণগঞ্জ শহর যখন ডুবেছিল ওই সময়ে অন্য অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, বানভাসীদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, খাবার স্যালাইন নিয়ে বন্যার্তদের মাঝে বন্টন করাসহ মানবিক সহায়তার কাজগুলো অত্যন্ত দরদ দিয়ে সম্পন্ন করেছে মুসলিম। এমন মানবিক গুণের অধিকারী হবার জন্য দরকার দেখার মতো চোখ। মুসলিম ওর চারপাশের সামাজিক বৈষম্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে বলেই সমাজ থেকে অপশক্তি বিতাড়নে রেখেছে অদম্য সাহসী ভূমিকা। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত থেকে আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছে মুসলিম খান।
১৯৮৮ সালের ২৮ নভেম্বর (সম্ভবত) আমাদের একটা কর্মসূচি ছিল ডায়মন্ড সিনেমা হল চত্বরে। যুব-গণ অনশন। দিনভর অনাহারে থেকে সেদিন শতাধিক ছাত্র-যুবক কর্মসংস্থানের দাবিতে কর্মসূচি সফল করেছি। বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের উদ্যোগে দেশব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। আমি তখন যুব ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সভাপতি। কবি অশোক গুহ সাধারণ সম্পাদক। আমরা ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে শহরের বিভিন্ন ইউনিটে যোগাযোগে বেরিয়েছি। রাতে খানপুরে যেয়ে মুসলিমকে পেলাম। কর্মসূচি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হলো। পরদিন যথাসময়ে মুসলিম উপস্থিত হলো দশ-বারোজনকে সঙ্গে নিয়ে। বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৫ দলের নেতৃবৃন্দ আমাদের মুখে পানিও শরবত তুলে দিয়ে অনশন ভঙ্গ করান। মলয় দাস চন্দন আমাদের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেন। অনশন মঞ্চেই কর্মসূচি পালনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা হলো সংগঠনের প্যাডে। যুব ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি তখন দেবল চৌধুরী, অ্যাডভোকেট কাজী জহিরউদ্দিন কাবলু সাধারণ সম্পাদক। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রেস রিলিজ নিয়ে ওখান থেকে বাসে চড়ে ঢাকায় রওনা হলাম। ওই সময়ের প্রথম সারির কয়েকটি পত্রিকা অফিসে প্রেস রিলিজ পৌঁছে দিয়ে সবশেষে গেলাম মগবাজারে। দৈনিক পত্রিকা অফিসে। ওখানে তখন এটম ভাই সিনিয়র রিপোর্টার পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমার শুকনো মুখ দেখে অফিসের পাশেই এক রেস্তেরোঁয় নিয়ে গেলেন জোর করে। খাওয়া শেষে আবার নিয়ে এলেন তাঁর অফিসে। পরিচয় করিয়ে দিলেন দৈনিক পত্রিকার বার্তা সম্পাদক কবি কামাল মাহমুদ এবং জেনারেল ম্যানেজার কে এম বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে। কামাল মাহমুদকে অনুরোধ করে বললেন- আমাকে যেন একটা দায়িত্ব দেওয়া হয় দৈনিক পত্রিকায়। কামাল মাহমুদ জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে পরামর্শ করে আমাকে পরদিন বিকেলে দেখা করতে বললেন। পরদিন সেখানে গেলে আমাকে ১ ডিসেম্বর থেকে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে জানানো হলো। কর্মসংস্থানের দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি যে আমার জন্য এমন একটি পেশার দিগন্ত খুলে দেবে- তা কে জানতো! আমার এরকম প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে তখন অনেকের মুখেই প্রাঞ্জল কথা শুনেছি। আজ এ লেখার মধ্যে দিয়ে বলি- এটম ভাই, আপনি আমাকে অনেক ঋণী করেছেন; যা শুধু স্নেহের ও ভালোবাসার। যে ঋণ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া অন্যভাবে সম্ভব নয়।
মুসলিম খান দুলারা নেই- এ কথা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী! প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসভরা মানুষটি আমার না যাওয়ার কারণে জামালপুরে গেল বেড়াতে। শিল্প ও বন্দরনগরীর দমবন্ধ করা যান্ত্রিকতা থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাবে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গধন্য হয়ে- এ আশাতেই ছুটে গিয়েছিল মান্যবর কবিবন্ধু বাকী বিল্লাহর জামালপুর শহরের বজ্রাপুরের বাসভবনে। সেখানে বেড়ানো শেষে নারায়ণগঞ্জে ফিরে আমার সঙ্গে দেখা করার বাসনা প্রকাশ করে গেল কত না আশায়! ৭ অক্টোবর করীম রেজাই ফোনে জানালো মুসলিম খানের অসুস্থতার খবর। সময় পেলে যেন একবার যাই দেখে আসতে- সে কথাটিও বলেছিল। এরপর জানালো চূড়ান্ত বেদনার সংবাদ। আমি বেদনায় মুষড়ে পড়িনি, শোকাহত হয়েছি। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করেছি আমার বন্ধু সতীর্থ সহযাত্রী মুসলিম খানের যেন বেহেশত নসিব হয়। মুসলিম খান দীর্ঘায়ু পায়নি কিন্তু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। তার সংগ্রামী চেতনায় যে বাংলাদেশের স্বপ্ন লালিত ছিল তা কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে। জাতির জনককে হত্যার প্রতিবাদে যে সাহসী পদযাত্রায় সে স্লোগান তুলেছে- ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’- সে বর্বরতম হত্যাকা-ের বিচার এবং রায় অনেকটা কার্যকর হয়েছে। শিল্প শহর নারায়ণগঞ্জে অসংখ্য নতুন নতুন কল-কারখানা গড়ে উঠেছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে এ শহরে সমহারে; কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। ওর বন্ধুদের গড়া শিল্প-কারখানায় কাজ করে অনেক পরিবারের দারিদ্র্য মোচন হয়েছে।
মুসলিম খান বিত্ত-বৈভবের, বিপুল ধনসম্পদের মালিক হতে চায়নি; চেয়েছিল একটি শান্তির জনপদ- যেখানে নিরাপদে বেড়ে উঠবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। যেখানে তার বন্ধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পথিকৃৎ রফিউর রাব্বির আত্মজ তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর নৃশংস হত্যার মতো আর কোনো হত্যাকা- হবে না। যেখানে ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে সমাজের বিবেকবান মানুষের সমাবেশ করতে হবে না মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিভাস্বর নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ অথবা রাজপথে। যেখানে বিচার দাবিতে নীরবে কান্নায় বুক ভাসাবে না কবি ওয়াহিদ রেজার মতো কেউ। যেখানে সংগ্রামী চেতনায় দীপ্ত কবি ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে একই সঙ্গে হত্যা করা হয় নির্মম অত্যাচারে- তেমন সন্ত্রাসের সন্ত্রস্ত জনপদ দেখতে চায়নি মুসলিম খান। তাইতো সেও নেমে আসতো প্রতিবাদী সভা-সমাবেশে; যোগ দিত রাজপথে বিক্ষোভ মিছিলে।
মুসলিম খান আজীবন সংগ্রামী এক সরল মানুষের প্রতিকৃতি- যার স্মৃতি ভাস্বর হয়ে থাকবে তার কর্মে। মহান সৃষ্টিকর্তা মুসলিম খানের পরিবারের সবার ধৈর্য ধারণে শক্তি দিন।
মাতৃজঠর থেকে জন্ম, জীবন ও মৃত্যু নিয়েই সব মানুষের গল্প; কিন্তু সবার কথা সবাই স্মরণ করে না। কমরেড মুসলিম খান, আমরা সতীর্থ যারা তোমার কথা ও কর্মকে জীবনভর স্মরণ করবো।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-
‘নয়ন সমুখে তুমি নাই/নয়নের মাঝে নিয়েছ যে ঠাঁই’। অথবা ‘স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি/ভারমুক্ত তুমি হেথা নাই’।
-বজলুর রায়হান, উপদেষ্টা সম্পাদক, টাইমওয়াচ

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd