ঢাকা : সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:২৯:০৫
খরস্রোতা ধরলা এখন মৃতপ্রায়!
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা


 


এক সময়কার খরস্রোতা ধরলা নদী এখন মৃতপ্রায়! অথচ দশ বছর আগেও ছিল পানির প্রবাহ ও প্রাণের স্পন্দন। মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ এ নদী বাংলাদেশের মোগলহাটের কর্তপুর দিয়ে প্রবেশ করে কুড়িগ্রামের অদূরে যাত্রাপুরে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বর্তমানে দুই শতাধিক চর সৃষ্টি করে নদীটি এখন ফুলবাড়ীর মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে। এখন শুধু বালুচর আর বালুচর। গভীরতা কমে যাওয়ায় মানুষ পা হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে ধরলার বুক দিয়ে। অনেক স্থানে নদীটির বুক যেন এখন আবাদী জমি। ধরলা শুধু এখন কালের সাক্ষী। শুধুই ধরলা নদী নয় এর সাথে বারোমাসিয়া, নীলকুমর, দুধকমর নদীসহ ধরলার তীরবর্তী হাজার হাজার হেক্টর জমি ইরি-বোরো আবাদের চরম হুমকির মুখে।
সেচ পাম্পগুলো দিয়ে পর্যাপ্ত পানি উত্তোলন না হওয়ায় হাজার হাজার কৃষক এখন দিশেহারা। ধরলা, বারোমাসিয়া, নীলকুমর নদীগুলোর মধ্য ভাগে কোথাও কোথাও জেগে উঠেছে চর। এমনকি বৃহৎ আকারে দ্বীপচর জেগে উঠেছে ফুলবাড়ীর শিমুলবাড়ী ও নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের চর-যতিন্দ্র নারায়ণ, চর-পেচাই, চর-গোরক ম-প এবং লালমনিরহাটের চরখারুয়া, বোয়ালমারী এবং বিলুপ্ত ছিটমহল বাঁশপেচাইকে নিয়ে।
চারদকে ধরলাসহ বেষ্টিত এ দ্বীপ চরটিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার লোকের বসবাস। নাব্য না থাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ডিঙ্গি নৌকা চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। এখানকার যে পরিবারগুলো এক সময় ধরলায় মাছ শিকার করে জীবন-জীবিকা চালাত তারা তাদের দীর্ঘদিনের পেশা হারিয়ে কেউ দিনমজুর, কেউ বাড়িঘর ছাড়া, আবার কেউ বেকার জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে অসংখ্য চরাঞ্চল সৃষ্টি করে এক সময়কার খরস্রোতা ধরলা মরা নদীতে পরিণত হওয়ায় সেখানকার মানুষজনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে অসংখ্য চর জেগে ওঠা ধরলা নদী ফুলবাড়ী উন্নয়নের একমাত্র অন্তরায় বলে ভুক্তভোগী মানুষজন জানিয়েছেন।
হাজার হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। চরম বিপর্যয় ঘটছে এ এলাকার কৃষিতে। বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র। অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। স্বচ্ছ ও সুপেয় পানির অভাবে এ এলাকার মানুষের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো লেগেই আছে। ফলে এ অঞ্চলে মরুকরণের লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
ধরলাপাড়ে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন একটি মহল শেখ হাসিনা ধরলা সেতুর পশ্চিম পাড়ের প্রেটেকশন বাঁধের নিকট স্থান থেকে অবৈধ্যভাবে বালু উত্তোলন করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সোনাইকাজী গ্রামে ধরলার পাড়ে বিএডিসির পাওয়ার পাম্প (গভীর নলকূপটি) দিয়ে আর পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফুলবাড়ী ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক মো. জাকারিয়া মিঞা বলেন নদী শাসনের ব্যবস্থা না থাকায় এক সময়কার খড়শ্রোতা ধরলা এখন গতিহীন হয়ে পড়েছে। ধরলার তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া চাপ পড়েছে দুইপারে। ফলে দ্রুত ভাঙ্গছে ধরলার দুইপাড়। এভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় নদী শাসন। কৃষক ও কৃষি জমি রক্ষায় দ্রুত সরকার ব্যবস্থা নিবে আশা করি।
রাম প্রসাদ গ্রামের মুসা মন্ডল (৬২) বলেন, প্রাায় ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত পাওয়ার পাম্প (গভীর নলকূপটি) এখন অকেজো। নষ্ট হয়ে গেছে গভীর নলকূপটি। কারণ ধরলায় এখন পানিও নেই, পাওয়ার পাম্পের ক্যানেলও নেই। আগে আমার জমি দিয়ে দেড় থেকে দুইশত ফিট লম্বা ক্যানেল ছিল। ধরলা পাড়ের সাবেক মেম্বার মজিবর রহমান পাওয়ার পাম্পের কিছু সামগ্রী বিক্রি করেছেন এবং বাকি গুলো তিনি ভাড়া দিয়েছেন। বর্তমানে পাওয়ার পাম্পের ক্যানেলসহ কোন কিছুই নেই। আছে শুধু চর আর চর।
একই কথা জানালেন, শেখ হাসিনা ধরলা সেতু পাড়ের চা বিক্রিতা তছলিম উদ্দিন (৪৫)। স্থানীয় আলমগীর ও আমিনুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, এক সময়ে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জের লোকজন বড় বড় নৌকা নিয়ে ব্যবসা করার জন্য এ এলাকায় আসত। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় তারা আর এখানে আসেন না। ধরলা পাড়ের নৌকার মালিকরা নৌকা চালাতে পারছেন না।
ধরলার পাড়ের মাছ চাষি আফজাল হোসেন বলেন, স্থানীয় মাঝিরা ধরলা নদী প্রচুর মাছ শিকার করতো। মাছ শিকার করে তাদের পরিবার চলতো। ধরলা এখন মরা। এখানে কোন মাছ নেই, তারা সারা দিন জাল দিয়ে মাছ ধরেও  ৫০ টাকার মাছও পায় না। তারা বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্ট করে বেঁচে আছি। তিনি আরও জানান, গত এক বছর ধরে ধরলায় নদীতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করছি। ধরলায় পানি না থাকায় ভাসমান খাঁচায় মাছ করা করা যাচ্ছে না। সরকার ধরলা নদীতে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করলে এখানকার স্থানীয় মাছ চাষী ও জেলে পরিবারগুলো মাঝে স্বস্তি ফিরে পাবে এবং তারা আগের মতোই মাছ শিকার করে জীবিকা নিরবাহ করতে পারবে।
ফুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ হারুন জানান, এ নদী পুনরুদ্ধার করতে হলে তলদেশ খনন এবং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে নদীটি আবার তার আগের রূপ ফিরে পাবে। সেই সাথে ধরলা পাড়ের হাজারো মানুষের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সারা দেশ পাতার আরো খবর

Developed by orangebd