ঢাকা : মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১৩:৪১:৪৯আপডেট : ০৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১৩:৪২:৪৪
স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
বদর উদ্দিন আহমদ

 

ভ্রমণে বাড়ে আত্মবিশ্বাস, ভ্রমণে বাড়ে জ্ঞান। আর এই ভ্রমণ একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে। কেউ ভালো বাসে নদ-নদী। কেউ আবার পাহাড়-পর্বত। আর আজ লেখা পাহাড়-পর্বত নিয়েই।
কিছু মানুষের ইচ্ছের ঘুড়িগুলো উড়ে বেড়ায়, মেঘ পাড়ি দিয়ে কিছু সময় আকাশও ছুঁতে চায়। মনের অন্তহীন গভীরতা থেকে ছুটি নিয়ে উড়ে চলে যেতে চায়। তবে কথায় আছেÑ ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আপনার এই অভিলাষী মনের সব ইচ্ছাই পূরণ করবে ভারতের পাহাড়ের রাজ্য দার্জিলিং। দার্জিলিংয়ের প্রতিটি বাঁকে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হবে আর তাকিয়ে শুধু ডুবে যেতে মন চাইবে। প্রকৃতিক সুন্দর্য্য লিলাভূমির সে অপরূপ এক সৈন্দর্য়্য বহন করে চলছে এই দার্জিলিং। যেদিকেই তাকাই মন আনন্দে ছুঁয়ে যায়। নিজেকে তখন কবি কবি ভাবতে ভালোই লাগে। সেই সাথে ভ্রমণের আনন্দে অন্যমনে গানের কলি বেরিয়ে পরে নিজের অজান্তে। হীমশীতল অনুভূতিতে মন ও গা জড়িয়ে যায়। দার্জিলিং এর ছোট এই শহরে বাসোবাস করে ১ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ। আর এই দার্জিলিং জুড়ে যে বাংলায় কথা বলে সব কাজ করবেন তা কিন্তু নয়। এখানকার বেশীর ভাগ মানুষ নেপালী কিংবা ঋণটানী ইন্ডিয়ান। তাদের নিজেদের ভাষা আছে আর তা সত্যিই দুর্বোধ্য। হিন্দি কিংবা ইংরেজিতে কথা বলে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
ভ্রমণ কাহিনী
আমি সব সময়ই একজন স্বাধীনচেতা, ভ্রমণ পিয়সী মানুষ। আমাকে সব সময়ই হাত ছানি দিয়ে টানে নতুন কিছু দেখার এবং তা উপভোগ করার জন্য। গত বছরও কোলকাতায় গিয়ে রবীন্দ্র নাথের বিখ্যাত সেই শান্তি নিকেতনসহ কোলকাতার আশপাশ ঘুরে বেড়িয়েছি, স্ত্রী ও ছেলেসহ। এই বছরও তেমনি দার্জিলিং যাওয়ার জন্য ছেলে তন্ময়ের উৎসাহে, ভারতের চেংড়াবন্ধা ভিসার জন্য যমুনা ফিউচার পার্কের ভিসা সেন্টারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ জমা দেই। কিন্তু আমার ব্যাক্তিগত চাকুরীর কাগজপত্র জমা দেইনি। কারন আমি অবসরে আছি লিখে দিয়েছিলাম। আমাদের তিনজনের (ছেলের, স্ত্রীর এবং আমার) পাসর্পোট জমা দিলে নির্ধারিত তারিখে আমার স্ত্রীর ও ছেলের পাসপোর্ট ভিসা সহ ডেলিভারী দিয়েছে। কিন্তু দু:খের বিষয় আমার পাসর্পোট দেয়নি। আমাকে ভারতীয় ভিসা অফিস থেকে ফোন দিয়ে আমার প্রফেশন জানতে চান এবং প্রফেশনের প্রমান পত্র অর্থাৎ নিয়োগ পত্র সহ অন্যান্য ডকোমেন্ট জমা দিতে বলেন। এখানে বলে রাখা ভালো এর আগেও আমি অনেকবার ভারত ভ্রমনে গিয়েছি। কিন্তু ইতিপূর্বে আর কখনও আমার নিকট এই ধরনের কাগজ-পত্র  চাননি। যাই হউক পরের দিন যথারীতি আমার সাংবাদিকতার নিয়োগ পত্রসহ আইডি কার্ডের ফটো কপি জমা দিলে আমাকে ভারতীয় হাই কমিশন থেকে ফোনে জানানো হয়। আমাকে “j4” ক্যাটগরিতে অর্থাৎ স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
সাংবাদিকতার ভিসা দিবে। কী আর করা শেষ পর্যন্ত  “j4” ক্যাটগরির ভিসা নিয়েই যেতে হল। আগে থেকে আমাদের টিকেট কাটা ছিলো। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭:৩০ মিঃ শ্যামলী পরিবহনে (কমলাপুর থেকে) করে রওনা হয়ে ভোর ৬:৩০ টায় বুড়িমারী বর্ডারে গিয়ে আমি ও আমার স্ত্রী দুজনে পৌঁছেছি। এর পর অপেক্ষার পালা বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের জন্য। বুড়িমারী বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের অফিস প্রায় তিন ঘন্টা অপেক্ষার পর সকাল ৯টায় খুলে।  বুড়িমারী এবং চ্যাংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন, কাষ্টম এর কাজ শেষ করে ভারতের চ্যাংরাবান্ধা অংশ থেকে বাসে উঠে ২ ঘন্টার মধ্যে ভারতের শিলিগুড়ি পৌঁছি। ওখান থেকে সুমো জীপে করে ৩ ঘন্টায় দার্জিলিং গিয়ে পৌঁছি। সেখানে আমাদের জন্য তিন দিন আগে থেকেই আমার মেয়ে (তন্বী) জামাই (সাব্বির) এবং আমাদের নাতনী (পদ্ম) অপেক্ষা করছিলো। দার্জিলিং শহরের রাজবাড়ীর পাশে পাহাড়ের চূড়ায় সুন্দর একটি বাংলোর মতো রেষ্ট হাউজ (হীমশিখা হোমষ্ট্রেতে)। এই সুন্দর রেষ্ট হাউজের প্রোপাইটর মি: দীপক শর্মা, যিনি ওখানের ইউসিও ব্যাংকের প্রাক্তন ম্যানেজার। তার স্ত্রী (নির্মলা শর্মা) যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে (অনুসুয়া শর্মা) থাকে ব্যাঙ্গলোর। এই পরিবারটি চমৎকার ব্যবহার। তাদের সুন্দর অতিথী পরায়নে এবং যাদের ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ। তাদের পরিবারের সাথে আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। অবশ্য মাঝে-মধ্যে আমরা বাইরে হোটেলেও খেয়েছি।  যাই হোক ৭ নভেম্বর ভোরে মি: দীপক শর্মার স্ত্রী (নির্মলা শর্মা) নিজেই আমাদের জন্য বেড টি নিয়ে হাজির। সেই সাথে আমাকে জানিয়ে গেলেন যে, মি: দীপক শর্মার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাদের নিয়ে সুন্দর একটি পার্কে যাবেন। যে পার্কটির নাম (SHRUBBERY NIGHTINGALE PARK)। আসলেই অদ্ভুত সুন্দর একটি জায়গা, নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবেনা। যেখানে ভোর বেলাতেই মানুষ জগিং, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি করে থাকে। সেই স্পটে গিয়ে আমার ও আমার স্ত্রীর (নীরু) মন ভালোহয়ে গেলো। এখানে বলে রাখা ভালো এই পার্কের চূড়া থেকেই আমরা সেই বিখ্যাত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলাম। মি: দীপক শর্মা পার্কের উপর থেকে দেখালেন কাঞ্চনজঙ্ঘাটি। যেই কাঞ্চনজঙ্ঘার নাম অনেক শুনেছি। বইয়ের পাতায়, সিনেমাতে দেখেছি। আজ এতো কাছ থেকে দেখছি তখন আনন্দ আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। এখানে কিছুক্ষণ ফটো সেসন, এবং স্থানীদের সাথে কথা বলে পরিচিত হয়ে বেশ ভালোই লাগলো। আসলে ঐদেশের সবাই খুব আন্তরিক। খুবই হেল্পফুল। যে কোন ব্যাপারে জানতে চাইলে, সুন্দর করে বুঝিয়ে দিবে। এক কথায় আপনার যা কিছু প্রয়োজন। যেমন- দেশ, এলাকা, লোক,ভাষা ও ইতিহাস যা-ই আপনি জানতে চাননা, কেনো সব কিছুই সুন্দর ও সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দিবে। তবে আপনাকেও বুঝে নিতে হবে। তার জন্য ভাষা একটি প্রধান অন্তরায় আমাদের জন্য। কারণ সবাই এখানে বাংলা ভাষা বুঝেনা। ইংরেজি এবং হিন্দী সবাই বুঝে। তাই তেমন খুব বেশী একটা সমস্যা হয়না। আমরা দার্জিলিং শহরের আশ-পাশ ঘুরে বেড়িয়ে, অবশেষে মিরিকের উদ্দ্যেশ্যে স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
রওয়ানা হলাম। আগে থেকেই সাব্বির গাড়ী ঠিক করে রেখেছিলো। আমাদের ড্রাইভারের নাম মি: সঞ্জয়। ভালো ড্রাইভ করে নতুন একটি টয়োটা রেসিংবেইজ কার ছিলো আমাদের সাথে। মি: সঞ্জয়ই আমাদের সুন্দর গাইড হিসেবে কাজ করেছে। ওখানের প্রতিটি ড্রাইভারই ভালো গাড়ী চালান এবং তারা গাইড হিসেবেও কাজ করে থাকেন। তেমনি আমাদের ড্রাইভার মি:সঞ্জয়,  যেখানে দেখার মতো ভালো কিছু ছিলো, সেখানেই গাড়ী থামিয়ে স্পটগুলো দেখিয়ে চলেছেন, রেইন ফরেস্ট এর পাইন বাগান, নেপাল বর্ডার, কাঞ্চনজংঘা, দার্জিলিং এর বিখ্যাত টি গার্ডেন, সবশেষে মিরিক পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিটি স্পটই আমাদের ভালো লেগেছে। কিন্তু মিরিকের লেকটি দেখে হতাশ হয়েছি। কারণ আমরা এর চাইতেও অনেকগুন বড় এবং ভালো লেক আমাদের দেশেও অনেক আছে। পুরো ভ্রমণটি আমাদের সাথে ছিলো পদ্ম লোচন। তার কথা না বললেই নয়। কারণ তিনিই আমাদের সব কিছুর মধ্যমণি। হাসি,কান্না, রাগ, অভিমান সব মিলিয়ে একাকার। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের আদরের নাতনী, পদ্ম। রাগ হলে নানার দাঁড়ি ছেড়া, চোখের চশমা খুলে নেওয়া এসব তার কাছে নস্যি ব্যাপার। ওর সবচাইতে বেশী দাবি বা আপত্তি নানা আর নানুর কাছে। একান্ত প্রয়োজন না হলে মা-বাবার কাছে এই কয়েটা দিন যেতেই চাই নি। আমাদেরও এই ভ্রমণটা বেশ লেগেছে। তারপরও আংশিক অপূর্ণ রয়ে গেছে। দুটি কারণে, প্রথমত ছেলে তন্ময়কে সাথে নিয়ে যেতে পারি নাই। দিত্বিয়টি অনেক ঘুরে দেখা বাকি রয়ে গেছে আমার স্ত্রী ও নাতনীর কল্যাণে। কারণ এদের নিয়ে এইসব পাহাড়, পর্বতে খুব ভালো করে ঘুরে দেখার সম্ভব নয়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আল্লাহ যদি সাহায্য করেন, তবে আগামিতে আবার যেতে পারি। আমার অনেক অপূর্ণ স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য। তবে এখানে বলে রাখি। ভ্রমণ করতে হলে দুই ভাগে করা যায়। প্রথমত আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনি কী ধরনের ভ্রমণে আগ্রহী। আয়েসি (বেশী টাকা খরচ করে ) নাকী সত্যিকারের ভ্রমণের উদ্দ্যেশে। যদি আপনি সত্যিই দেশ-বিদেশ ঘুড়ে বেরিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চান। তাহলে আপনাকে কৃচ্ছতা সাধন করতে হবে। এক কথায় কী করে কম টাকা খরচ করে বেশী উপভোগ করা যায়। এখানেও দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য আপনি চাইলে অনেক কম খরচে ঘুরে আসতে পারেন। আবার আয়েস করেও বেড়িয়ে আসতে পারেন। সেটা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ আপনার উপর। কারণ আপনি চাইলে ঢাকা রংপুর বাস অথবা ট্রেনে যেতে পারেন। আবার রংপুর থেকে বুড়িমারী বর্ডার পর্য়ন্ত লোকাল বাসে যেতে পারেন। আর চেংড়াবন্ধা (ভারত) থেকেও কিছু অংশ অটোতে মাথা ভাঙ্গা চেক পোস্টের আগে তিন রাস্তার মোড়ে। ওখান থেকে বাসে করে শিলিগুড়ি যেতে পারেন এবং শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত শেয়ারে জীপ আছে। এইভাবে গেলে এবং একটু হিসাব করে ট্যুর প্লান করলে অনেক কম খরচে দার্জিলিং ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঢাকা থেকে শ্যামলী পরিবহনে শিলিগুড়ি পর্যন্ত টিকেট কেটে এবং শিলিগুড়ি থেকে রিজার্ভ জীপে দার্জিলিং গেলে খরচ একটু বেশী হবেই। তাই ট্যুর প্লানটি আপনি আপনার মতো করে ছক করে নিন। আপনারা কেউ ইচ্ছা করলে এই ট্যুর প্লানটি ফলো করতে পারেন। তাতে করে অনেক কম খরচে দার্জিলিং সহ এই ভ্রমনটি করে আসতে পারেন। চেংড়াবন্ধা বর্ডারে ইন্ডিয়ার এন্ট্রি সীল নিয়ে বর্ডারেই ডলার বা টাকা ভাঙ্গিয়ে ফেলুন। শিলিগুড়িতে দাম কম পাবেন। এখানে সব কাজ শেষ করে অটোতে করে সরাসরি চলে যাবেন স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
মাথা ভাঙ্গা চেক পোস্টের আগে তিন রাস্তার মোড়ে। ভাড়া নিবে মাত্র ৩০ রুপি। কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই শিলিগুড়ি গামী ঘইজঞঈ বা বেসরকারী গাড়ি পেয়ে যাবেন। সরকারী গাড়িতে ৬৯ রুপি আর বেসরকারীতে ৭০ রুপি ভাড়া নিয়ে শিলিগুড়িতে চলে আসতে পারবেন। সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত। এখন আপনাদের কিছু ট্রিক্স বলি। রাতের পাহাড়ীয়া রাস্তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারাই জানেন এটা কতটা সুন্দর। তবে নতুন যারা যাবেন তারা দিনের দৃশ্যটা মিস করবেন। শিলিগুড়ির মেইন শহর বলতে ভেনাস মোড়কেই বুঝায়। এখানে বড় বড় শপিংমল সহ সব কিছুই আছে। তাই কেনাকাটার জন্য এটা বেস্ট প্লেস। দার্জিলিং পাহাড়ের শহর। এখানে খুব দ্রুত রাত নামে। তাই শিলিগুড়ি গিয়ে সিম কিনে ঙণঙ, ইড়ড়শরহম.পড়স , গধশব সু ঞৎরঢ় থেকে হোটেল বুক করে ফেলুন। দার্জিলিংগামী শেয়ারড ট্যাক্সিগুলো জংশন বাস স্ট্যান্ড এর কাছ থেকেই ছাড়ে। এখান থেকে ১৫০ রুপি করে প্রতি জন দার্জিলিং চলে যেতে পারবেন। হোটেল বুকিং শেষ হলে কিছু খেয়ে নিন। ১৫০ রুপিতে পেট ভড়ে ভাত, মুরগী পাবেন। অবশ্যই সন্ধ্যা ৫ টার মধ্যে ট্যাক্সিতে করে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন। ৫ টার মধ্যে যাত্রা শুরু করলে ৮.৩০ এর মধ্যে রাতের পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে দেখতে দার্জেলিং পৌঁছে যাবেন। রাস্তায় খাবারের দোকান পাবেন সেখান থেকে ১০০ রুপির মধ্যে কিছু খেয়ে নিবেন। কারণ আপনি যখন দার্জিলিং পৌঁছবেন তখন কোন কিছু নাও পেতে পারেন। দার্জিলিং পৌঁছে ফ্র্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। এনার্জি সংরক্ষণ করুন। কারণ আপনার জন্য এডভেঞ্চার অপেক্ষা করছে । দার্জিলিং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এই শহর নিম্ন হিমালয়ের মহাভারত শৈলশ্রেণীতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুটি (২,১৬৪.১ মি) উচ্চতায় অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থাধীনে থাকলেও দার্জিলিং জেলার প্রধান শহর দার্জিলিংযরে স্থানীয় প্রশাসনে আংশিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা রয়েছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের চিত্তাকর্ষক সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রতিবছর হাজার পর্যটক এখানে ভিড করেন। দার্জিলিং শহরের মাঝখানে রয়েছে জামে মসজিদ। এর সাথেই রয়েছে মুসলিম খাবারের হোটেল। এখানে ৬০ রুপির গরু ঋণনা, আর পরাটা সব মিলিয়ে ৮০ রুপিতে পেট ভরাতে পারবেন। সকাল সকাল উঠলে ৩ ঘণ্টার দার্জিলিং ঘুরে দেখতে পারবেন। তবে আপনি যদি শীতকালে দার্জিলিং যান তবে এখানে একদিন থেকে অবশ্যই সান্দাকপু থেকে ঘুরে আসবেন। এবার কাউকে জিজ্ঞেস করলেই কালিম্পং গামী ট্যাক্সি স্ট্যান্ড টা দেখিয়ে দিবে। এখানে ১৪০ রুপিতে শেয়ারড ট্যাক্সিতে করে ৩ ঘণ্টার জন্য এক চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখা অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য রেডি হউন। পথের মধ্যে পাহাড়ীয়া তিস্তা নদী, ঘন বন, উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি আর কত কি-না আছে।
দার্জিলিংয়ের ইতিহাস
দার্জিলিংয়ের ইতিহাস সিক্কিম, নেপাল, ভূটান ও ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীন ভাবে জড়িত। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্য্যন্ত সিক্কিম রাজ্য দ্বারা দার্জিলিং সংলগ্ন পাহাড়ী অঞ্চল এবং নেপাল রাজ্য দ্বারা শিলিগুড়ি সংলগ্ন তরাই সমতল অঞ্চল শাসিত হত। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে নেপালের গুর্খারা সমগ্র পাহাড়ী অঞ্চল অধিকারের চেষ্টা শুরু করলে সিক্কিম রাজ্যের ছোস-র্গ্যাল তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নেপালীরা তিস্তা নদীর তীর পর্য্যন্ত সিক্কিম সেনাবাহিনীকে হঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এই সময় সমগ্র উত্তর সীমান্তে নেপালীদের বিজয়যাত্রা রুখতে ব্রিটিশরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত ইঙ্গ-গুর্খা যুদ্ধের ফলে গুর্খারা পরাজিত হয়ে পরের বছর সগৌলি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির ফলে সিক্কিম রাজ্য থেকে অধিকৃৃত মেচী নদী থেকে তিস্ত নদী পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল নেপালীরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে তিতালিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চল ছোস-র্গ্যালকে ফিরিয়ে দিয়ে সিক্কিম রাজ্যের সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করে।
স্বপ্নের রানী দার্জিলিং
দার্জিলিং চা চাষ, ১৮৯০
গ্রীষ্মকালে সমতলভূমির প্রচন্ড দাবদাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ আধিকারিকেরা দার্জিলিংয়ের মনোরম আবহাওয়ায় বসবাস শুরু করলে দার্জিলিং একটি শৈলশহর ও স্বাস্থ্য উদ্ধারকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। আর্থার ক্যাম্পবেল ও রবার্ট নেপিয়ার এই শৈলশহর গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টার ফলে ১৮৩৫ থেকে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদ ও ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হলে দার্জিলিংয়ের জনসংখ্যা শতগুণ বৃদ্ধি পায়। ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমতলের সঙ্গে সংযোগকারী প্রথম সড়কপথ নির্মিত হয়। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য অস্ত্রাগার নির্মিত হয় এবং ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে এই শহরকে পুরসভায় পরিণত করা হয়। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাণিজ্যিক ভাবে চা চাষ শুরু হলে বেশ কিছু ব্রিটিশ চা প্রস্তুতকারক এই স্থানে বসবাস শুরু করেন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং শহরকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী রূপে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হয়। স্কটিশ ধর্মপ্রচারকরা ব্রিটিশ আধিবাসীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা শুরু করেন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল চালু হলে শহরের উন্নয়ন আরেদ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়।
ব্রিটশ শাসনকালের শুরুতে দার্জিলিংকে অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত জেলা হিসেবে গণ্য করা হত, যার ফলে ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য জেলাতে প্রযোজ্য আইন এই অঞ্চলে বলবত হত না। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলকে একটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দার্জিলিং অঞ্চলের চা বাগানগুলিতে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র বিপ্লবীরা বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসনকে হত্যার চেষ্টাও করেন। ১৯৪০-এর দশকে এই জেলার চা শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে কমিউনিস্টরা ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার পর দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং ও তরাই অঞ্চলের কিয়দংশ নিয়ে নির্মিত দার্জিলিং জেলাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পাহাড়ে নেপালীরা প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করলেও তরাই সমতলে ভারত ভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত বিশাল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাসতুরা বসবাস করতে শুরু করে। নেপালীদের দাবীগুলির প্রত্যুত্তরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিস্পৃহ মনোভাবে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে দার্জিলিংয়ের স্বায়ত্তশাসন ও নেপালী ভাষার স্বীকৃতির দাবী ওঠে।
১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সিক্কিম নামক একটি নতুন রাজ্যের উদ্ভব হলে এবং ভারত সরকার দ্বারা নেপালী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধান অনুসারে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের নিস্পৃহতা লক্ষ্য করে এই অঞ্চলে গোর্খাল্যান্ড নামক একটি নতুন রাজ্য তৈরীর জন্য বিংশ শতাব্দীর আশির দশক জুড়ে ব্যাপক ও হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ নামক একটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদলের সৃষ্টি করা হয়, যাদের ওপর এই জেলার প্রশাসনিক স্বায়ত্তাসনের অধিকার দেওয়া হয়। ২০০৮-০৯ সাল নাগাদ ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার পৃথক রাজ্যের দাবী মেনে নিতে অস্বীকৃত হলে পুনরায় ধর্মঘট আন্দোলন শুরু হয়। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে একটি চুক্তির ফলে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামক একটি নতুন স্বায়ত্তশাসিত পার্বত্য পরিষদ গঠন করে এই জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

printer
সর্বশেষ সংবাদ
পর্যটন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd