ঢাকা : মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল, ২০১৯ ১২:০৬:৩১
স্বাগত বিশাখা, স্বাগত বৈশাখ
নজরুল মৃধা


 


স্বাগত ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। স্বাগত পহেলা বিশাখা থেকে বৈশাখকে। এদিনটি বাঙালির উৎসবের দিন। অভিবাদন হে নতুন তোমাকে। এই দিনটি এলে পুরো জাতির হৃদয় আলোড়িত হয়। উৎসবে মেতে ওঠে ছেলে, বুড়ো আবাল বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই। পুব আকাশে সূর্য ওঠার সাথে সাথে আমরা স্বাদ গ্রহণ করি নতুন দিনের। সংখ্যা গণনার দিক থেকে এক সংখ্যা থেকে শুরু না হলেও বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ  অথবা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। এক থেকে শুরু না হলেও আমরা ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়েছি। এই একদিন প্রাণের সমস্ত আবেগ দিয়ে আমরা মেতে উঠি উৎসব উদযাপনে। আমাদের দেশে শহর এবং গ্রামের আয়োজন ও আন্তরিকতায় বেশ প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়। শহরে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পাঞ্জাবি, ফতুয়া পরে ছেলেরা এবং মেয়েরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়েন। তারা ছোটেন বৈশাখী মেলা ও অনুষ্ঠানের দিকে। সেখানে গিয়ে পান্তা খেয়ে একদিনের জন্য বাঙালি হওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। অপরদিকে গ্রামাঞ্চলে দিনটি কীভাবে কাটে তা অনেক কৃষকই জানেন না। তবে গ্রামীণ কৃষকরাই এক সময় বৈশাখে মূল ভূমিকা রাখতেন। গ্রামের মানুষ এসময় ফসল তোলার নানান আচার-অনুষ্ঠান করতেন। গ্রামে বৈশাখ আর আগের মতো প্রাণের স্পন্দন জাগায় না। তাই অনেককেই বলতে শোনা গেছে, গ্রাম থেকে পহেলা বৈশাখকে হাইজ্যাক করেছে শহর।
বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলা যায়, নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে বঙ্গাব্দের বারো মাসের নাম এসেছে। এই নামসমূহ গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ “সূর্যসিদ্ধান্ত” থেকে।  বৈশাখ মাস এসেছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, তেমনি  জ্যৈষ্ঠ মাস জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, আষাঢ় উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়ে নক্ষত্রের নাম অনুসারে, শ্রাবণ শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ভাদ্র-উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে, আশ্বিন অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে, কার্তিক কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে অগ্রহায়ণ (মার্গশীর্ষ) মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, পৌষ পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, মাঘ মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ফাল্গুন উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে এবং চৈত্র মাস চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে।
তবে সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী’র মাসের নামগুলি প্রচলিত ছিল পারসি ভাষায়। এগুলো ছিল যথাক্রমে ফারওয়াদিন, আর্দি, ভিহিসু, খোরদাদ, তির, আমারদাদ, শাহরিযার, আবান, আযুর, দাই, বহম এবং ইসক্নদার মিজ।
এদিকে সপ্তাহের ৭ দিনের নামকরণও করা হয়েছে বিভিন্ন দেব- দেবীর নামানুসারে। যেমন রবিবারের নামকরণ করা হয়েছে, রবি বা সূর্য দেবতার নামানুসারে। সোমবারের নামকরণ করা হয়েছে সোম বা শিব-এর নামানুসারে এবং মতান্তরে চাঁদের নামানুসারে। মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং শনিবারের নামকরণ করা হয়েছে যথাক্রমে, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনি গ্রহের নামে।
পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই নববর্ষ পালনের রেওয়াজ আছে। তবে একেক দেশে একেক রীতি। ইরানে সুপ্রাচীনকাল থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে নওরোজ উৎসব। প্রাচ্যের চীন, কোরিয়া, জাপানসহ গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পালন করা হয়ে থাকে নববর্ষ। এসব দেশে নববর্ষ আসে চাঁদের আলোয়। বসন্তকালে, ইংরেজির ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চের দ্বিতীয় ধাপের যেকোনো দিন হতে পারে এই নববর্ষ। এই সময়ের মধ্যে যেদিন নতুন চাঁদ উঠবে সেদিনই শুরু হয় নতুন বছরের। একে বলা হয় লুনার ক্যালেন্ডার। আরবি হিজরি সনের সঙ্গে অবশ্য এর কোনো মিল নেই।
এবার সংক্ষেপে জেনে নেই আমাদের বাংলা সনের ইতিহাসটি। সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎসব ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময় কৃষকদের খাজনা পরিশোধে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশমতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন।
আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে।
তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকেন। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এদেশে  আমরা বাংলা নববর্ষ আমরা পালন করি ঘটা করে। তবে ইলিশ প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলা যায়, ১৮ শতকের শেষের দিকে ধনিক শ্রেণি এদেশে পান্তাভাতের সাথে ইলিশকে ঢুকিয়ে দেয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইলিশ আমাদের মাঝে শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করেছে।
তবে ইলিশে ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন স্বয়ং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নিজে ইলিশ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন এবং জনগণকে ইলিশ না খেতে পরামর্শ দিয়েছেন। ইলিশের এই স্বর্ণ মূল্যে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে অনেকেই ইলিশ বর্জন করেছেন। কারণ মার্চ -এপ্রিল ইলিশের প্রজনন সময়। এসময় ইলিশ ধরা আইনত নিষিদ্ধ। অতীতে বর্ষবরণে ইলিশের কোনো প্রচলন ছিল না। এটা বর্তমান সময়ের একটি প্রচলিত প্রথা করতে চাচ্ছে ধনিক শ্রেণির এক জাতীয় লোক। বৈশাখ আমাদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করুক- এই প্রত্যাশা করছি সকলের কাছে।
নজরুল মৃধা : কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd