ঢাকা : সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পণ্য মজুদ আছে, রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী          বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার          অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব ব্যবস্থা নিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী          বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা          দেশের সব ইউনিয়নে হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকবে
printer
প্রকাশ : ১৯ মে, ২০১৯ ১০:৩১:৩৬আপডেট : ২১ মে, ২০১৯ ১৫:৪৯:৫৮
বালিশ চোরেরা নটবর লালের মতো অধরা থেকে যাবে না তো
নজরুল মৃধা


 


পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিনসিটি আবাসন পল্লীর বিছানা, বালিশ, আসবাবপত্র অস্বাভাবিক মূল্যে কেনার অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগগুলো যদি সত্যি হয় তা হলে মানবিক চেতনায় কত ভয়াবহ অধপতন হয়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারি অফিসে অরাজকতার উচ্চতা কত ওপরে উঠেছে তা ভাবতেই শিউরে উঠতে হবে। চক্রটি শুধু ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখায়নি। এসব মালামাল ভবনে তোলা বাবদও নজিরবিহীন উচ্চ মূল্য দেখিয়ে অতীতের সব ধরনের চুরির রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এসব ভাবলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে যারা এসব করেছে তারা আসলে কি এ দেশের নাগরিক! তারা কি ধরা পড়বে? তাদের কি জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে। কোন সাহসে একটি বালিশের দাম ধরা হলো ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। অতীতের অন্য ঘটনাগুলোর মতো এই ঘটনারও শেষটা দেখা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পেপার- পত্রিকায় লেখালেখি হবে। আদালতও হয়তো নির্দেশনা দিবেন। রাষ্ট্রযন্ত্র এক সময় দায় সারার জন্য হয়ত কিছু একটা বলবে। এর পর সব থেমে যাবে। এ ধরনের ঘটনায় এমনটা আশঙ্কা করাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশের মানুষের কাছে। ন্যায়পরায়ণতায় কোথায় যেন একটি ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে এমনটা ঘটেছে এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। রূপপুরের মতো অনেকস্থানেই যে অস্বাভাবিক মূল্যে জিনিসপত্র কেনা হয়নি এর নিশ্চয়তা কোথায়? চোখ-কান খুলে একটু দেখলেই হয়ত দেখা যাবে বালিশের চেয়ে বড় বড় চুরি দেশে হচ্ছে। কিন্তু কেউ দেখছে না। যা হউক বালিশ সমাচারে হাইকোর্ট থেকে একটি আদেশ এসেছে। হাইকোর্ট গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ওই গ্রিনসিটি আবাসন পল্লীর বিছানা, বালিশ, আসবাবপত্র অস্বাভাবিক মূল্যে কেনা ও তা ভবনে তোলার ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়ে  ১৯ মে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, ১২৫টি ফ্ল্যাটের মালামাল কিনতে ও ওঠাতে ২৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যা প্রত্যেক ফ্ল্যাটের জন্য খরচ পড়ে ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকার মতো। একটি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে এর দাম বাবদ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা আর সেই বালিশ নিচ থেকে ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ ৭৬০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এক কেজি ওজনের একটি বৈদ্যুতিক কেটলি নিচ থেকে ফ্ল্যাটে তুলতেই খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার টাকা। একই রকম খরচ দেখানো হয়েছে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেক্ট্রিক আয়রন ওপরে তুলতে।  প্রায় আট হাজার টাকা করে কেনা প্রতিটি বৈদ্যুতিক চুলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি। এছাড়া প্রকল্পটির গাড়ি চালকের বেতন ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা, যা একজন সচিবের কাছাকাছি। বর্তমানে সচিবের বেতন ৭৮ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পটির গাড়িচালকরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন। এতে আরও ১৮ হাজার টাকা পাবেন গাড়িচালকরা। এতে তাদের বেতন দাঁড়াবে ৯১ হাজার ৭০৮ টাকা। প্রকল্পটির সর্বনিম্ন বেতন রাঁধুনি বা মালির। প্রকল্প থেকে তিনি বেতন পাবেন ৬৩ হাজার ৭০৮ টাকা। আর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করলে অতিরিক্ত পাবেন ১৬ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তার বেতন পড়বে ৭৯ হাজার ৭০৮ টাকা। সরকারি টাকায় উচ্চমূল্যে আসবাবপত্র কেনার পর তা ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে তুলতে অস্বাভাবিক হারে অর্থ ব্যয়ের এ ঘটনা ঘটিয়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের পাবনা গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। হাই কোর্টে রিট ছাড়াও এ ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিষয়টি যেহেতু তদন্ত কমিটি ও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে- তাই দেশের মানুষ কিছুটা আশা করতে পারে এমন অস্বাভাবিক অর্থ দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত তাদের বিচার হবে। কিন্তু দেশবাসী সেই সাথে এমন আশঙ্কাও করছেন এদেশে তদন্ত কমিটির নামে ধামাচাপা  দেয়ার অসংখ্য  ঘটনা রয়েছে। মাত্র দুইশ’ টাকার জিনিস ৭ হাজার টাকা বিক্রি দেখাতে বুকের পাটা লাগে। এটি নিঃসন্দেহে বলা বলে- ওদের বুকের পাটা আছে। তা না হলে বাজার মূল্যের চেয়ে শতগুণ বেশি দাম দেখানো সম্ভব হতো না। এই চুরিকে পুকুর কিংবা সাগর চুরির সাথে তুলনা করা হলে পুকুর এবং সাগরকে অপমান করা হবে। তাই এদেরকে বুকের পাটা এবং চুরির বিশালতার জন্য পুরস্কার দেওয়া উচিত। কারণ তাদের এই চুরি তাজমহল চুরিকেও হার মানিয়েছে। স¤্রাট শাহজাহানের তাজমহলও এক সময় চুরি হয়েছিল। সেটি করেছিল ভারতের প্রতারক মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব। সে নটবর লাল নামেই পরিচিত ছিল। সে জালিয়াতি করে পুরো তাজমহলটি বিক্রি করে দিয়েছিল অন্যের কাছে। সে শুধু তাজমহলই নয়- লাল কেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবন এমনকি পার্লামেন্ট হাউজ পর্যন্ত নানান ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেয়। অবশ্যই জালিয়াতির মাধ্যমে। তার এই জালিয়াতি কোনো ক্রেতাই ধরতে পারেনি। তাকে ধরার জন্য ভারত সরকার বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই চোর কিন্তু কখনোই পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি। সবসময়ই সে অধরা থেকেছে। তাই এখানে আশঙ্কা করা যেতে পারে- আমাদের দেশের বালিশ চোরেরা  নটবর লালের মতো শেষ পর্যন্ত অধরা থেকে যাবে নাতো।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd