ঢাকা : শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • পবিত্র আশুরা ১০ সেপ্টেম্বর          ডিএসসিসির ৩,৬৩১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          সংলাপের জন্য ভারতকে ৫ শর্ত দিল পাকিস্তান          এরশাদের শূন্য আসনে ভোট ৫ অক্টোবর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ৩০ জুলাই, ২০১৯ ১৬:১১:৪৯আপডেট : ৩০ জুলাই, ২০১৯ ১৬:২০:০৮
মানুষ গড়ার কারিগর আমার বাবা
আরিফুল ইসলাম


 

বাবা, কিছুদিন থেকে ভাবছি তোমাকে নিয়ে কিছু লিখব; কিন্তু ইচ্ছে করেই যেন আবার দূরে থাকা। বেশ কিছুদিন ধরেই তোমাকে খুব মনে পড়ছে, অনেক অদ্ভূত কিছু চিন্তা মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে। আমি আমার কল্পনার জগতে তোমার ছবি আঁকি, তোমাকে দেখি না প্রায় ৭ মাস হতে চলল, কী আশ্চর্য, তাই না? ভাবি এই ৭ মাসে তোমার কতটুকু পরিবর্তন হতো? তোমাকে দেখতে কেমন লাগত এখন? জানো বাবা আমি রাস্তাঘাটে যখন বয়স্ক কোনো লোক দেখি, তখন তোমার কথা মনে মনে ভাবি- এখন হয়তো বাবাকে দেখতে ঠিক এমনই লাগত!
 
বাবাকে হারানোর পর থেকে অন্তরটা এক মহা শূন্যতায় সবসময় হাহাকার করতে থাকে। যেন জ্বলন্ত একটা আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়ে গেছে আমার অন্তরটা, যা থেকে সবসময়ই কষ্টের লাভা নির্গত হতে থাকে। আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়তো এক সময় থেমে যায়; কিন্তু প্রিয়জনকে হারানোর কষ্টের যে লাভা নির্গত হয়, তা কখনোই থামে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারানোর কষ্টের যন্ত্রণার আগুন আরও বেড়ে যায়। বাবা ছিলেন আমার সব। বাবা ছাড়া আমি যেন কিছুই না।
 
গত কয়েক মাস আগেও আমার বাবা এই পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। আর এখন সবই স্মৃতি। বাবাকে পাই অনুভবে।
 
আমি গত বছরের ২৮ নভেম্বর ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাই বাবার সঙ্গে কিছুদিন থাকার জন্য। ৩০ নভেম্বর বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার সময় বাবাকে বললাম, বাবা এবার আমি ঢাকা ফিরে যাব। বাবা আমার চলে যাওয়ার কথা শুনে কান্না শুরু করে দিলেন। বললাম, বাবা আমার ছুটি শেষ। কয়েক দিন পর আবার আসব। আমার এই কথা শোনার পর তিনি বললেন, আমাকে একা রেখে তুমি যেও না। কিন্তু আমি বাবার আবদার রাখতে পারলাম না। বাবাকে বাড়িতে মায়ের কাছে রেখেই ঢাকা চলে আসতে হলো।
 
শুক্রবার রাতে ঢাকা পৌঁছলাম। আর বাবা শনিবার থেকেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। বাড়ির সবার কাছে বার বার আমার কথা জিজ্ঞেস করতেন, আরিফ কবে বাড়ি আসবে? তারা জানাল, কয়েকদিন পরে আসবে। বাবার মন তা মানতে চাইল না। বাচ্চাদের মতো বলতে থাকলেন, আরিফকে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে বলো।
 
মাত্র এলাম এখনই আবার অফিস থেকে ছুটি পাই কি-না এই ভেবে বাড়ির কেউ আমাকে বাবার কথাগুলো বলেননি। আমি চিন্তা করব তাই।
 
বাবা মারা যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে গ্রামের বাড়ি থেকে আমার বোন ও ফুফাতো ভাই ফোন দিয়ে জানালেন, বাবার শারীরিক অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়, বারবার নাকি আমাকে খুঁজছেন। আমাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠছেন। আমি বড় বোনকে বললাম, বাবাকে বলতে যে আমি আসছি।
 
তখন আমি অফিসে ছিলাম। অফিস থেকে রওয়ানা হলাম বাড়ির উদ্দেশে। রাত ৮.১৫ মিনিটের গাড়িতে উঠে সকাল ৯টায় বাবার কাছে পৌঁছলাম।
 
ঘরে গিয়ে বাবাকে সালাম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে দেখে বললেন, আসছ বাবা? তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। বাবার কথাটা শুনে আমার কান্না এসে পড়ল। আড়াল করে বললাম, বাবা আমি এসে গেছি, এবার অনেকদিন থাকব আপনার কাছে। বুঝতে পারলাম বাবা আমাকে দেখে অনেক খুশি হয়েছেন।
 
বাবাকে বললাম, আমি আসার সময় কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডার থেকে আপনার জন্য দই নিয়ে আসছি, আপনাকে একটু খাইয়ে দেব? বাবা বললেন, দাও। সেই দই থেকে এক চামচ দই খেয়ে বললেন, এখন আর খাব না, পরে খাব। কিছুক্ষণ পর বাবা নিজ থেকেই আবার দই খেতে চাইলেন। আমি বাবাকে আরও দুই চামচ দই খাইয়ে দিলাম। ওইটুকু খেয়ে বললেন, আর খাব না। দই খাওয়ানোর পর বললাম, আপনার পাশে বসে কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করি? বললেন, করো। কোরআন শরিফ খুলে বাবাকে বললাম, সূরা ইয়াসিন পড়ি? বাবা বললেন, পড়ো। বাবার সামনে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ে শোনালাম। কোরআন তেলাওয়াত করার পর বাবার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।
 
আমি বাবার কাছ থেকে এক মুহূর্তও দূরে যাইনি। দুপুর ১২.৩০ মিনিটে বাবাকে বললাম, আপনাকে গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিই? বললেন, দাও। ১২.৪০ মিনিটে বাবাকে আমি কোলে করে বারান্দায় নিয়ে গেলাম। তারপর চেয়ারে বসিয়ে গোসল করিয়ে দিলাম। গোসল শেষ করে আবার কোলে করে বাবার ঘরে এলাম।
 
ওই সময়ই আমার কোলে বাবা নীরবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন! আমার হাতে তার শেষ গোসল আর আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
 
ছোটবেলায় দেখতাম কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন বিলাপ করে কাঁদেন। আমি বুঝতাম না ব্যাপারটা। তারা কী কী যেন বলেন। বিলাপ করার কী আছে? ইচ্ছাকৃত এমন করে নাকি অন্যকিছু! যেদিন বাবাকে হারালাম সেদিন আমি নিজেও অনেক বিলাপ করে কেঁদেছি। আমার সেই বিলাপে কী কী বলেছিলাম মনে নেই। কিন্তু এমনই কিছু বলতে মন চাইত, যা বললে অন্তরটা ঠাণ্ডা হয়, ভেতরের জ্বালা কমে! প্রিয়জন হারালে হয়তো এমনই হয়, সবাই তাই বিলাপ করে!
 
তোমার কথা খুব মনে পড়ে বাবা, মাথায় অনেক ভাবনা ঘোরপাক খায়। ভাবি এভাবে করলে হয়তো বাবা বেঁচে থাকতেন, আর একটু যদি যত্ন নিতাম বাবা বেঁচে যেতেন, থাকতেন আমাদের মাঝে! কত খুশি হতেন, কত আনন্দ করতেন আজকে! এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো কারণই খুঁজে পাই না, কেন চলে গেলেন বাবা, আমি না কিছুই মেলাতে পারি না।
 
আমার কেন যেন বেশি আনন্দ পেতে ইচ্ছে করে না, কোনো সুখের স্বাদ নিতে মন টানে না। যা করি শুধু করতে হবে বলেই করে যাচ্ছি, ভেতরটায় কেমন শূন্য লাগে।
 
বাবাকে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর লোকজন বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় মারার জন্য। আমার বাবাসহ প্রায় ২০ জন লোককে মারার জন্য লাইনে দাঁড়াতে বলে পাকিস্তানি বাহিনী। বাবা সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে মনে মনে দোয়া পড়ছেন, এমন সময় আমাদের এলাকার এক রাজাকার পাকিস্তানি বাহিনীকে বললেন, লাইনে তো একজন মাস্টার রয়েছে। তখন তারা বললেন, কে সেই মাস্টার? তখন বাবা বললেন আমি। সরকারি চাকরি করার কারণে বাবা সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন।
 
বাবা এসএসসি পাস করার পর অনেক লোক দেখতে এসেছেন। কারণ তখনকার সময় এসএসসি পাস করা লোক ছিল হাজারে একজন।
 
বাবা যে স্কুলে বদলি হতেন সেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বৃত্তি পেত। প্রতিদিন সকালে বাবা যখন স্কুলে যেতেন তখন সঙ্গে করে একটি হারিকেন নিয়ে যেতেন। কারণ যে সব ছাত্রছাত্রী বাবার ক্লাসের পড়া পারত না তাদেরকে সন্ধ্যা ৭ থেকে ৮টা পর্যন্ত ক্লাস করাতেন। এই জন্য বাড়ি থেকে হারিকেন নিয়ে স্কুলে যেতেন। হারিকেন নিয়ে বের হওয়ার আরও একটি কারণ ছিল- বাবা স্কুল শেষ করার পর বাড়ি ফেরার আগে ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে আসতেন, তারা ঠিকমতো পড়ালেখা করে কি-না। বাবার ভয়ে ছাত্রছাত্রীরা রাতে ঠিকমতো পড়ালেখা করত। তাই তারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করত।
 
স্কুলকে বাড়ির মতো ভালোবাসতেন বলে স্কুল প্রাঙ্গণ গাছপালা আর ফুলে ভরিয়ে দিতেন। মন্তলা ও শালধর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে কয়টি বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে তা বাবার লাগানো। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি।
 
বাবা যে ভালো মানুষ তা আমরা সহজে বুঝতে পারতাম। কখনও কোথাও একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কিংবা সন্ধ্যা নাগাদ বাজারে দেখলে অনেকেই (পরিচিত কিংবা অপরিচিত) আমাকে বলতেন, 'এই মাস্টারের ছেলে এখানে কী করছ, বাড়ি যাও, বাড়ি যাও'। সবাই এভাবে চোখে চোখে দেখে রাখতেন বলে আমাদের কারও কোনো ধূমপান কিংবা অন্য কোনো বদঅভ্যাস তৈরি হয়নি। এলাকার লোকজন বলতে গেলে সুযোগই দেননি। বাবা যে দিন চাকরি মেয়াদ পূর্ণ করলেন সেদিন তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চোখে পানি দেখেছি। সব ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে বাবাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান।
 
২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় আমার বাবা আলহাজ মাস্টার মোহাম্মাদ মোস্তফা (৮০) চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন মায়ার বন্ধন, সুখের সংসার, বিচরণ ভূমি, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, পবিত্র শিক্ষাঙ্গন ও হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আর তার আদর্শ।
 
৭ মাস পর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তনই এসেছে। শুধু বাবা নেই, নিজের মধ্যে অপরাধবোধ নিয়েই বলি- বাবা ভালো থেকো ওপারে। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন, মহান আল্লাহ যেন আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন। আমিন।
লেখক : এই গল্পে মাস্টারের ছেলে ।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

Developed by orangebd