ঢাকা : রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

সংবাদ শিরোনাম :

  • দ্বীপ ও চরাঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে ইন্টারনেট          দুদকের মামলায় সম্রাটের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর          এয়ার শো’তে যোগ দিতে দুবাইয়ে প্রধানমন্ত্রী           সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে : স্পিকার          রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর          বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই : হাছান মাহমুদ
printer
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৬:৪১:৩৬
নুনেরটেকের কান্না
খায়রুল আলম খোকন


 


উত্তাল মেঘনার বুকে হঠাৎ চোখ আটকে যায় এক ভাসমান চরে। যেখানে দিগন্তজোড়া বালুচরে গবাদিপশুর দল খুঁজে বেড়ায় কচি ঘাস। জমি চাষের জন্য ভোরবেলায় কৃষক বেরিয়ে পড়েন লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে। নদীর বুকে মাছ ধরার সারি সারি জেলে নৌকা ভেসে বেড়ায় এখানে সেখানে। বলছি অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মেঘনা নদী পরিবেষ্টিত নুনেরটেকের কথা।
সোনারগাঁও উপজেলার বারদী ইউনিয়নের পত্যন্ত চরাঞ্চল নুনেরটেক। এটি এ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড। নুনেরটেক এলাকা ১১টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। এখানে ১১টি পাকা মসজিদ আছে। মহল্লাগুলোর নাম- নুনেরটেক চৈতারসাম, নুনেরটেক পূর্বপাড়া, টেকপাড়া, ডিয়ারা লালপুরীর মাজার পাড়া, হাজীবাড়ি, ডিয়ারা পশ্চিমপাড়া, চুয়াডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়া, রগুনারচর, সবুজবাগ ও গুচ্ছগ্রাম।
জানা যায়, এখন থেকে প্রায় ১৮০-২০০ বছর আগে এ চরে বসতি শুরু হয়। সেসময় বারদীবাজার এ অঞ্চলের ব্যবসা- বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। এখানে তাঁতের সাদা মার্কিন কাপড় ও খইয়া জাল তৈরি করা হতো। নৌকাযোগে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আসতেন বারদী বাজারে। নানা রকম পণ্যসামগ্রীর সাথে সূতি সুতা ও কাপড় ক্রয়-বিক্রয় হতো এ বারদী বাজারে। ওই সময় বারদীতে আসতেন নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, হোমনা, ঢাকা, কুমিল্লার ব্যবসায়ীরা। উত্তরে ভৈরব, নরসিংদী, আশুগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট এবং ভারতের আসাম পর্যন্ত বিস্মৃত ছিল এ ব্যবসা।
কথিত আছে, সেসময় এক ঝড়ের রাতে লবণ বোঝাই ৭/৮টি গয়না নৌকা আসামে যাওয়ার পথে বারদী এলাকায় নোঙ্গর করা হয়। সে ঝড়ের কবলে পরে লবণের গয়না নৌকাগুলো মেঘনা নদীতে ভেসে যায়। এক সময় এগুলো মাঝ নদীতে ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া লবণের সেই গয়না নৌকাগুলোর উপর বালি জমে নদীতে এক সময় চর ভেসে ওঠে। নদীর এখানটায় লবণের নৌকা ডুবার কারণে লোকজন ভেসে ওঠা এ চরের নাম দেয় নুনেরটেক।
পরে মেঘনার তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে কৃষক ও জেলে সম্প্রদায় বসতি গড়ে তোলেন এ চরে। শুরুর দিকে এ চরে রাতের বেলায় কেউ থাকতে সাহস করতেন না। ফসল রক্ষা করার জন্য পাহারা দিতে এক সময় সাহস করে কয়েকজন কৃষক খড়-কুটা দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি করে গরু-বাছুর আর ফসল নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই চরে মানুষের বসতি বাড়তে থাকে। এখন এ চরে প্রায় ২০ হাজার লোকের বাস।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হয়ে গেলেও এ গ্রামে এখন পর্যন্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ভোটের আগে এ চরে ছুটে আসেন। প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচিত হলে এটা করবো- সেটা করবো। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর এ চরবাসীর কথা তাদের মনে থাকে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সরকার একের পর এক ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু নুনেরটেকে বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনে কেউই উল্লেখযোগ্য কাজ করেনি। বরং নিরীহ চরবাসীকে বোকা বানিয়ে তাদের কাছ থেকে নানা সুবিধা নিয়েছে। মেঘনা নদী থেকে বালি কাটার নামে চর কেটে শেষ করে দিয়েছে। কৃষকের ফসলি জমি, বসতবাড়ি কেটে নিয়েছে। সর্বশান্ত কৃষক ভিটে বাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। গ্রামছাড়া বহু পরিবার। যারা বড় রাজনীতিবিদের আজ্ঞাবহ নেতা বা কর্মী তাদের কথামতো না চললে এলাকার সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ নেই। সাধারণ মানুষকে চুষে বা জোর-জবরদস্তি করে অর্থ উপার্জন করেছে।
নুনেরটেক এলাকায় সামান্য একটু পাকা রাস্তা আছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। নুনেরটেক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে লালপুরীর বাজার পর্যন্ত। বাকি সব কাঁচা রাস্তা। অনেক রাস্তা আবার গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে যা বাড়ির লোকজনকে পড়তে হয় বিপাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে গ্রামীণ মসজিদে প্রাথমিকভাবে মক্তব চালু আছে। নুনেরটেকে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে; কিন্তু বিদ্যুৎ ও উন্নত পরিবেশ না থাকায় এখানে কোনো শিক্ষক পোস্টিং নিতে চায় না। ১৯৯৩ সালে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে এমপিও পায়নি। কয়েক বছর আগেএলাকাসীর সহযোগিতায় একটি নূরানী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানায় একটি কিন্ডার গার্টেন ও একটি মহিলা মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে শিক্ষা প্রসারের জন্য।
নুনেরটেক এলাকার চারদিকে নদী হওয়ায় এখানে যেতে বা এখান থেকে আসতে নৌকা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। এক সময় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে ছোট ডিঙ্গি নৌকা ছিল, মাছ ধরার একাধিক বড় নৌকা ছিল। এখন মাছ ধরার এবং ডিঙ্গি নৌকা কমে গেছে। এখন খেয়া পাড়াপাড়ের জন্য বাণিজ্যিকভাবে নৌকা পাওয়া যায়। এলাকায় রোগিদের চিকিৎসা করানোর জন্য কোনো ডাক্তার নেই, হাসপাতালও নেই। যার কারণে অনেক কষ্ট করতে হয় রোগীদের। সোনারগাঁও উপজেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই অনেক রোগী পথিমধ্যেই মারা যায়। বিশেষ করে প্রসুতি মা, শিশু ও বৃদ্ধদের বেশি কষ্ট করতে হয়।
একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ডাক্তার সব সময় পাওয়া যায় না। নুনেরটেকে একটি গ্রাম্য বাজার আছে। এ বাজারে সামান্য কিছু পণ্যসামগ্রী অন্য বাজার থেকে চড়া দামে এনে গ্রামবাসীর প্রয়োজন মেটায়। এ গ্রামে আধ্যাত্তিক পুরুষ তাবলীগ জামাতের প্রচারক হযরত মাওলানা নুরুল ইসলাম লালপুরী শাহ নামের একজন অলির মাজার আছে। যার কারণে এখানে হাজার হাজার লোক আসা-যাওয়া করেন।
এখানে শিক্ষার হার একেবারে কম। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু লোক বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিক্ষিত হচ্ছে। এ এলাকার শিক্ষার্থীরা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করছে। এলাকায় অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজ করেন। এসব কৃষক তাদের জমিতে ধান, পাট, গম, আলু, বাদাম, পিঁয়াজ, রসুন, মরিচ, সরিষা, তরমুজ, বাঙ্গিসহ নানা প্রকার শস্য উৎপন্ন করেন। অপরদিকে জেলেরা নদীতে মাছ ধরে, হাঁস, মুরগি, কবুতর, গরু-ছাগল পালন করে। কোরবানীর ঈদ সামনে রেখে ছাগল, গরু, ভেড়া মোটাতাজা করে ভালো অর্থ আয় করেন কেউ কেউ। বর্তমানে এখানকার লোকজন জীবিকার জন্য প্রবাসে পাড়ি দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন নুনেরটেকের অনেকে।
নুনেরটেক এলাকায় বাল্য বিবাহ একটি মারাত্মক সমস্যা। তবে আশার কথা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে আগের তুলনায় বাল্য বিবাহ অনেকটা কমে আসছে।
নুনেরটেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এক গ্রামীণ জনপদ। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফলে এ চর হয়ে উঠতে পারে এ সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক এলাকা। বিশেষ করে এ চরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে একটি চমৎকার পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু সোনারগাঁওয়ের কোনো রাজনৈতিক নেতারই সেদিকে নজর নেই। যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা এ চরকে কোটিপতি হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। চরবাসী তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে, চরের কেউ কেউ এসব নেতার সাথে হাত মিলিয়ে নিজেরাও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু নিরীহ চরবাসীর ভাগ্য ফেরেনি। তাদের বোবাকান্না পৌঁছায়নি শাসকের কানে।
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd