ঢাকা : সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১

সংবাদ শিরোনাম :

  • লকডাউনেও চলবে বইমেলা          সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর          ৫ থেকে ১১ এপ্রিল সারাদেশে লকডাউন, প্রজ্ঞাপন জারি          করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকলে আর্থিক খাতে কোনো ঝুঁকির আশঙ্কা দেখছি না : অর্থমন্ত্রী           বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন ৬১ শহীদ
printer
প্রকাশ : ০৪ মার্চ, ২০২১ ১১:১৭:০৯আপডেট : ০৪ মার্চ, ২০২১ ১১:২০:৫৪
এসডিজি অর্জনে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার
ড. এ কে আব্দুল মোমেন

 

ধরিত্রীর চার ভাগের তিন ভাগ জুড়েই রয়েছে সাগর-মহাসাগর, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ইকোসিস্টেম। অর্থনীতিতে সমুদ্রসম্পদের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃদ্ধি, অতিরিক্ত মৎস্য শিকার ও সামুদ্রিক দূষণের কারণে বৈশ্বিক সমুদ্রের সংরক্ষিত এলাকা থেকে প্রাপ্ত অর্জন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে সমুদ্রসম্পদের নিরাপদ আশ্রয়। জাতিসংঘের ২০১৭ সালের এসডিজি রিপোর্ট অনুসারে, বৈচিত্র্যময় সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকার গড় বিস্তৃতি ২০০০ সালের ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে মৎস্য আহরণ উপযোগী সামুদ্রিক জলরাশি অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। মৎস্য আহরণে অস্থিতিশীলতা ১৯৭৪ সালের ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৩ সালে ৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাগর, মহাসাগর ও সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০-এ গৃহীত হয়েছে এসডিজি ১৪। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১৪-এর লক্ষ্য হলো সামুদ্রিক জলরাশির ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় এলাকার ইকোসিস্টেমের দূষণ রোধ। সেই সঙ্গে সামুদ্রিক অম্লত্বের প্রভাব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনা বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ ও এর টেকসই ব্যবহার বৃদ্ধি করা। টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডার অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশও সাগর, মহাসাগর ও সমুদ্রসম্পদের টেকসই ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণ নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সমুদ্রসম্পদের চ্যালেঞ্জগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবেলা করতে দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে।
বাংলাদেশের মোট সমুদ্রসীমার আয়তন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ-পূর্ব থেকে শুরু করে সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের দিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৭১০ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিস্তৃত সমুদ্রাঞ্চল বিভিন্ন প্রজাতি ও ধরনের সমুদ্রসম্পদের উৎস। সামুদ্রিক কচ্ছপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা হলো সমুদ্রের পূর্ব উপকূল। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল অঞ্চলও এই পূর্ব উপকূলেই অবস্থিত। পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়ান এবং মধ্য এশিয়ান অঞ্চলের প্রায় ১০০ প্রজাতির অতিথি পাখির আবাসস্থল, বিচরণ কেন্দ্র এবং তাদের শীতকালীন অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় উপকূল এলাকাকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ১০ প্রজাতির উপকূলীয় পাখির আশ্রয়স্থল। পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও বিভিন্ন সরীসৃপ যেমন লোনা পানির কুমির ইত্যাদিরও আশ্রয়স্থল। সাম্প্রতিক এফএওর (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন) প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক উৎস হতে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ২৫তম এবং সামগ্রিক মৎস্য চাষে পঞ্চম। বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে ২০২২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের দখলে চলে আসবে মৎস্য আহরণের শীর্ষস্থান। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশেরও বেশি তাদের জীবিকার জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতে যুক্ত। বঙ্গোপসাগরের এসডিজি অর্জনে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার
উপকূলীয় এলাকা ও সামুদ্রিক একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মৎস্যজীবী পরিবারের ১৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এ সম্পদ থেকে। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৬ হাজার জেলে সরাসরি সামুদ্রিক মৎস্য খাতে যুক্ত। বাংলাদেশের নিজস্ব সমুদ্রসীমায় মোট আট মিলিয়ন টন মাছ মজুদের বিপরীতে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ টন মাছ ধরা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২ লাখ ২০ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ আবদ্ধ পানি থেকে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত পানি থেকে ২৮ শতাংশ ও সমুদ্র থেকে ১৬ শতাংশ আহরণ করা হয়। সামুদ্রিক মেস্যর ১ লাখ ২০ হাজার টন ছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং ৫ লাখ ৩৫ হাজার টন ছিল আর্টিসানাল (সনাতন) পদ্ধতিতে আহরিত।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের প্রায় পুরোটাই হয়ে থাকে উপকূলবর্তী অগভীর জলাঞ্চলে। উপযুক্ত মৎস্য আহরণ প্রযুক্তি এবং পর্যাপ্ত আধুনিক মৎস্য আহরণকারী জলযানের অভাবে এ এলাকার বাইরে মৎস্য আহরণ এখনো খুব একটা সুবিধাজনক হয়নি। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকে আধুনিকায়ন করতে কাজ করছে সরকার। ২০০০-০১ সালে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ ছিল ৩৭৯ হাজার ৪৯৭ টন, যা ২০১৪-১৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬২৬ হাজার টনে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১৬ শতাংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ থেকে। বছরে একক মাছ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ইলিশ, যার মূল্যও সবচেয়ে বেশি। এদেশে বার্ষিক ইলিশ আহরণের পরিমাণ প্রায় ৩৯৫ হাজার টন। বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্যসম্পদ ছাড়াও বাংলাদেশ সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা তেল ও গ্যাসের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র । যদিও এখন পর্যন্ত সমুদ্র এলাকায় তেল ও গ্যাস খননে খুব বেশি সাফল্য আসেনি। সমুদ্র এলাকায় তেল ও গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের নিকটবর্তী অগভীর সমুদ্রাঞ্চলকেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ এরই মধ্যে মিয়ানমারের আরাকান উপকূলীয় এলাকায় অনেকগুলো বড় গ্যাসক্ষেত্র (শিও, ফু, মিয়া) আবিষ্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশ অংশেও রয়েছে এর সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এরই মধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণে নিয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ।
দেশের প্রথম সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা হিসেবে সরকার ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর ‘দ্য সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা’ প্রতিষ্ঠা করে, যা তিমি, ডলফিন, সামুদ্রিক কচ্ছপ, হাঙর ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের প্রধান দুটি সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার বিস্তৃত জলসীমার পরিমাণ ২৪৩ হাজার ৬০০ হেক্টর (২ হাজার ৪৩৬ বর্গকিলোমিটার), যা দেশের মোট সামুদ্রিক জলসীমার প্রায় ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুমে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে নিলে মোট সংরক্ষিত এলাকার বিস্তৃতি বেড়ে দাঁড়ায় মোট জলসীমার ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ইলিশ সংরক্ষণ এবং ইলিশ উৎপাদনের ক্রমহ্রাসমান হার ঠেকাতে সরকার ‘মৎস্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ১৯৫০’-এর আওতায় উপকূলীয় লোনা ও মিঠাপানির এলাকায় ইলিশের জন্য পাঁচটি অভয়ারণ্য এবং চারটি ডিম নিঃসরণ ও প্রজননক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জাটকা নিধন রোধ এবং মা ইলিশ সংরক্ষণ ও পরিচর্যাও এ আইনের আওতাঋণক্ত। সামুদ্রিক এসডিজি অর্জনে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার
মৎস্যসম্পদ অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এর অধ্যায় ৫৫ (উপ-অধ্যায় ২, ঘ) এর মাধ্যমে সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের প্রজনন ও ডিম ছাড়ার মৌসুমে অবাধ চলাচল ও নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে মোট ২২ দিন (১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর, ২০১৬) সব ধরনের মাছ ধরা এবং মাছ ধরার বাণিজ্যিক ট্রলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ২০১৫ সালে এ নিষেধাজ্ঞার সময় ছিল ১৫ দিন (২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর, ২০১৫)। ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে বিগত কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ১৫ বছরে যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ বছর অনেক মা-মাছ বা ডিমওয়ালা ইলিশ বাজারে আসায় মনে হচ্ছে, মা ইলিশ সংরক্ষণের সময়সীমা আরো কয়েক দিন বাড়াতে হবে।
সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পরও সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। তেল কোম্পানি এবং নিলামকারীরা সহজসাধ্য ও স্বল্প ব্যয়ের কারণে সাধারণত সমুদ্র উপকূলীয় অগভীর অঞ্চলে খনন করতে আগ্রহী হয়। কিন্তু এসব এলাকায় খননকাজের ফলে সামগ্রিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং মৎস্যসম্পদের ওপর বিরাট বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া এসব খননকাজের সময় সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া তেল মৎস্যসম্পদ, মৎস্যক্ষেত্র, মৎস্য প্রজনন ও পরিচর্যা, লবণাক্ত জলাভূমির ইকোসিস্টেম, প্রবাল, ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম, উপকূলীয় পর্যটন, লবণ শিল্প, জনজীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে প্রাপ্ত সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলে জাহাজ ভাঙা ও মেরামত শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকা-; সমুদ্র উপকূলীয় পরিবেশের ওপর যার বিরাট প্রভাব রয়েছে। এ শিল্পের কারণে শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের এলাকার মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে জাহাজ ভাঙার সময় সামুদ্রিক খাদ্য শিকলে নিঃসরিত দূষণের ফলে। উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, অধিক পরিমাণে বাচ্চা মাছ নিধন, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ, পলি জমা, কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও দূষণ ইত্যাদির কারণে উপকূলীয় এলাকার জীববৈচিত্র দ্রুত কমে আসছে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে। মনুষ্যসৃষ্ট দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান মৎস্য চাহিদা ও আহরণ প্রতি বছরই বাড়ছে। একদিকে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার ও অন্যান্য অবৈধ প্রক্রিয়ায় মৎস্য আহরণের কারণে সব ধরনের মাছ ও চিংড়ি মারাত্মক নিধনের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে চিংড়ি ও নরম খোলবিশিষ্ট সামুদ্রিক কাঁকড়ার অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এদের বিভিন্ন প্রজাতি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই নিধন হচ্ছে। নগরের পয়োনিষ্কাশন, শিল্পবর্জ্য, তৈলবর্জ্য ও জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমের কারণে যেমন রাসায়নিক দূষণ ঘটছে, তেমনি বাড়ছে বায়ুমন্ডলীয় তাপমাত্রা। টেকসই সাগর ও মহাসাগর নিশ্চিতকরণের জন্য এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ একটি বিরাট সমুদ্র এলাকা অর্জন করেছে। এ বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল প্রাকৃতিক গ্যাস ও জীববৈচিত্রে পরিপূর্ণ। তবে সমুদ্রের তলদেশ থেকে অদক্ষ গ্যাস উত্তোলন সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবসম্পদের ওপর বিরাট খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই বর্তমানে দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে, যার একটি হলো ইলিশের নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র এবং অন্যটি তিমির অভয়ারণ্য। সমুদ্রসম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই। উপকূলীয় অঞ্চল এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং শিল্প কর্মকান্ডের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে যেকোনো উপায়ে। টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য মৎস্য আহরণও টেকসই মাত্রায় বজায় রাখতে হবে। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের নিমিত্তে সরকার এরই মধ্যে মৎস্য প্রজনন মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে এবং প্রায় তিন দশক পর উপকূলীয় এলাকায় মাছের প্রাচুর্য পর্যবেক্ষণের জন্য ২০১৮ সালে মৎস্য প্রজাতি পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ব্যাপ্তি এখন আর শুধু উপকূলীয় বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকার নিরাপদ বলয় তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সারা দেশে খাদ্যনিরাপত্তা, বিশেষ করে পুষ্টির জোগানে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে মৎস্য আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সহায়ক কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ ক্ষুদ্রায়তন মৎস্য শিল্পে নারীদের ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে এ খাতের উন্নয়নে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাডুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বিশ্বব্যাংকের ২৪০ মিলিয়ন ঋণসহায়তায় উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট শীর্ষক বৃহৎ একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা বা কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় সমুদ্র অঞ্চল আইন প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে সংঘটিত যেকোনো অবৈধ মৎস্য আহরণ, দস্যুতা, ডাকাতি কিংবা সহিংস ঘটনার মোকাবেলায় বিশেষ আইন করা হয়েছে। আইনে সমুদ্র অঞ্চল নির্ধারণ, দূষণ প্রতিরোধ, অবৈধ মাছ ধরা, দেশী-বিদেশী জাহাজের ওপর নজরদারি এবং সমুদ্রসম্পদ রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বিদেশী মৎস্য নৌযান কর্তৃক মৎস্য আহরণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন আইনে এ-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য অনধিক তিন বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫ কোটি টাকা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ড প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। দেশী-বিদেশী মৎস্য নৌযান কর্তৃক মাছ আহরণ করলে একই শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বাধা প্রদান, মৎস্য নৌযান ইত্যাদির ক্ষতিসাধন, প্রমাণাদি ধ্বংস ইত্যাদি অপরাধ করলে দন্ড যৌক্তিক পরিমাণে বৃদ্ধি করে অনধিক দুই বছরের কারাদন্ড বা অপরাধভেদে ১০ লাখ টাকা এবং অনধিক ২৫ লাখ টাকা দন্ডের বিধান করা হয়েছে। অধ্যাদেশে শাস্তির মেয়াদ অনধিক তিন বছর এবং জরিমানা ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ছিল। এটি বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ রক্ষা, ব্লু-ইকোনমি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়ে সমন্বিত আইন। আইনটিতে সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবহাওয়া ও জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর বেশি জোর দেয়া হয়েছে।
২০২০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে মেস্যর মজুদ বাড়ানোর লক্ষ্যে অনিয়মিত, অজ্ঞাত, অবৈধ ও অপরিকল্পিত মৎস্য আহরণ বন্ধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। টেকসই মৎস্য আহরণের জন্য বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র এবং এর মজুদ নির্ণয়ের জন্য গবেষণা ও জরিপ জাহাজ ‘মীন সন্ধানী’র মাধ্যমে জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য আইন ২০১৮ অনুমোদিত হয়েছে এবং বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য নীতি ২০১৬-এর সংস্কার করা হয়েছে এবং এটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় একটি ভেসেল ট্র্যাকিং মনিটরিং অফিস স্থাপন করা হয়েছে। অধিকতর নজরদারির জন্য ১৩৩টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারে ভেসেল ট্র্যাকিং মনিটরিং সিস্টেম (ভিটিএমএস) স্থাপন করা হয়েছে। ৬৭ হাজার ৬৬৯টি যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানের ডাটাবেজ প্রণয়ন করা হয়েছে। উপকূলীয় জেলেদের মাঝে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রীসহ মাছ ধরার জন্য ১১৮টি অত্যাধুনিক নৌকা বিতরণ করা হয়েছে। সামুদ্রিক জলরাশির ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় এলাকার ইকোসিস্টেমের দূষণ রোধ করে টেকসই সাগর, মহাসাগর ও সমুদ্রসম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ সরকার। সমুদ্র অর্থনীতি সামনে রেখে সমুদ্রে অব্যবহূত ও এর তলদেশে অ-উন্মোচিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এ অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত করতে আঞ্চলিক সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ।
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
 

printer
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

Developed by orangebd